গৌতম চক্রবর্তী, সুন্দরবন, ১১ জুন- মমতার বাংলা হারিয়ে দিল মোদির গুজরাটকে। ‘‌কন্যাশ্রী’‌র পর ‘সুন্দরিনী’। আবার বিশ্বে সমাদৃত বাংলা।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ভাবনার ‘‌সুন্দরিনী’‌ এবার সারা দেশে ‘‌মডেল’‌ হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই বিশুদ্ধ দুধ উৎপাদনে বিভিন্ন রাজ্য এমন–কি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটকেও টপকে দেশে সেরার সম্মান ছিনিয়ে এনেছে ‘‌‌সুন্দরিনী’‌। ঘটনাচক্রে, গুজরাটের মাটিতে দাঁড়িয়েই। ‘বিশ্ব দুগ্ধদিবস’ উপলক্ষে গুজরাটের আনন্দে ‘সুন্দরিনী’কে এই শিরোপা প্রদান করেছে রাষ্ট্রীয় দুগ্ধ উন্নয়ন পর্ষদ। শুধু তা–ই নয়, এই প্রকল্পকে ‘মডেল’ হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ওই সংস্থার‌‌। পাশাপাশি, ‘‌সুন্দরিনী’‌র সাফল্যের জন্য রাজ্য সরকারের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অধীনস্থ ‘‌সুন্দরবন দুগ্ধ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদক সমবায় সঙ্ঘ’‌ সারা দেশে সেরার তকমা পেয়েছে। 
শুধু দেশ নয়। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বণিক সংগঠন ‘ফিকি মিলেনিয়াম অ্যালায়েন্স’–এর তরফ থেকেও প্রথম পুরস্কারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এই প্রকল্পকে। আগে এমন স্বীকৃতি আর কোনও সমবায় সঙ্ঘ পায়নি। ফলে কন্যাশ্রীর পর এবার ‘‌সুন্দরিনী’ রাজ্য সরকারের সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করল। মহিলাদের আর্থিক উন্নয়নে এটি আরও একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন।
প্রসঙ্গত, দুগ্ধ উৎপাদনে তর্কাতীতভাবে দেশের সেরা ছিল গুজরাট। ১৯৭০ সালে ভার্গিস কুরিয়েনের হাত ধরে সেখানে শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন ফ্লাড’। সেই থেকেই মোদির রাজ্য দেশে দুধ উৎপাদনে অগ্রগণ্য। কিন্তু সেই রাজ্যের ভিটেতে স্বীকৃতি নিয়েই মমতার বাংলা এবার গুজরাটকে পেছনে ফেলল। ‘‌সুন্দরিনী’‌ আদতে সুন্দরবনের মহিলাদের পালন করা দেশি গরুর দুধ, গাওয়া ঘি, মুরগি ও হাঁসের ডিম, জঙ্গলের খাঁটি মধু, হারিয়ে যাওয়া দুধসর চাল ও মুগডালকে বাজারজাত করার প্রকল্প। ২০১৫ সালে এর নামকরণ করেন মুখ্যমন্ত্রীই। সুন্দরবনের মোট ৭টি ব্লকের ৬৫টি সমবায় সমিতি থেকে কাঁচামাল নিয়ে ‘‌সুন্দরিনী ন্যাচেরাল্‌স’‌ ব্র‌্যান্ডের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি হয়। বাসন্তী, মথুরাপুর–১ ও ২, কাকদ্বীপ, নামখানা, পাথরপ্রতিমা এবং জয়নগর–২ ব্লকের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মহিলা এই সমবায় সমিতির সঙ্গে জড়িত। এগুলি বিক্রির টাকা ১০ দিন অন্তর সরাসরি জমা পড়ে সমবায়ের মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
প্রাকৃতিক গুণসমৃদ্ধ এই ব্র‌্যান্ডের জিনিস সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি। কোনওরকম রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়। দুধ সংগ্রহ করতে ব্যবহার করা হয় স্টেনলেস স্টিলের পাত্র। রাসায়নিক বিক্রিয়ামুক্ত করতে কাচ বা স্টিলের পাত্র এবং কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এই প্রকল্পের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’ হিসেবে বাছা হয়েছে বাংলার জনপ্রিয় টিভি সিরিয়ালের অভিনেত্রী ‘ভুতু’ তথা আরশিয়া মুখোপাধ্যায়কে। আলিপুরে ‘‌সুন্দরিনী’‌র নিজস্ব বিপণিও রয়েছে।
সুন্দরবন দুগ্ধ ও প্রাণিসম্পদ সমবায় সঙ্ঘের ডিরেক্টর তথা জেলাশাসক রত্নাকর রাওয়ের কথায়, ‘এই সম্মান একটা বড় সাফল্য। সুন্দরিনী‌কে আরও বেশি করে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন এই জিনিসগুলি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ রত্নাকর জানাচ্ছেন, আগামী দিনে বাংলায় ‌‘সুন্দরিনী’‌কে বাজারজাত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এতে আরও বেশি মহিলার কর্মসংস্থানও হবে।
পথচলা শুরুর পর মাত্র ৩ বছরের মধ্যে দেশে সেরার শিরোপা পাওয়ার পেছনে কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুন্দরবন দুগ্ধ সমবায়ের এক আধিকারিক জানান, এখানে ভাবনার তারতম্যটাই বড়। অন্য রাজ্যের সমবায়গুলি শুধু দুধ নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু সুন্দরবন দুগ্ধ সমবায় দুধের সঙ্গে ডিম, ঘি, মধু, পনির, চালডাল সবই দেশীয় পদ্ধতিতে বিশুদ্ধভাবে উৎপাদন করেছে। তা–ও আবার মহিলারা। তাঁরা স্বনির্ভরও হয়েছেন। স্বচ্ছতা রাখার জন্য মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা জমা করেছে সমবায়। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এসব জিনিস উৎপাদন করতে তাঁদের প্রযুক্তিগত সাহায্য এবং প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। এটাই সারা দেশের অন্য রাজ্যের সমবায় থেকে আলাদা করে দিয়েছে ‘‌সুন্দরিনী’‌কে।
আপাতত দেশে মমতাই মোদির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রেও যে তিনি গুজরাটকে পেছনে ফেলার মতো প্রকল্পকে গোকুলে বাড়িয়েছেন, সম্ভবত মোদি নিজেও তা ভাবতে পারেননি।

দেশের সেরা ‘‌সুন্দরিনী’‌ প্রকল্পের মূল কারিগররা। ছবি:‌ আজকাল‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top