মিল্টন সেন, হুগলী: রথে চড়ে মাহেশ জগন্নাথ মন্দির থেকে মাসির বাড়ির উদ্দেশে পাড়ি দিলেন শ্রী জগন্নাথ। মন্দির থেকে মাসির বাড়ি, প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপস্থিত হাজার হাজার ভক্ত। উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন রাজ্যপাল শ্যামল সেন, মন্ত্রী তপন দাসগুপ্ত, মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি, বিধায়ক ব্যাচারাম মান্না প্রমুখ। রয়েছেন চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার অজয় কুমার এবং জেলা প্রশাসনের অধিকারিকবৃন্দ। 
বহু প্রাচীন এই রথ যাত্রাকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকেই দূর–দূরান্ত থেকে বহু মানুষের সমাগম হয় শ্রীরামপুরের মাহেশে। রথের দড়ি টেনে পূর্ণ্যার্জন করতে দূর দূরান্ত থেকে পূর্ণার্থীরা ভিড় করতে থাকেন। পূর্ণার্থীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল প্রশাসন। এদিন সকাল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি চলতে থাকে ড্রোনের নজরদারি। বিভিন্ন আবাসনের ছাদ বা উঁচু টাওয়ার থেকে রথযাত্রার রুটের ওপরে বিশেষ নজরদারি চালান পুলিশ আধিকারিকেরা। এককথায় উৎসব উপলক্ষে শ্রীরামপুর মাহেশকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। উপস্থিত রয়েছেন পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার। তিনি জানান, সকাল থেকেই মাহেশে প্রস্তুত ছিলেন পুলিশ আধিকারিকেরা। রয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ কর্মী, মহিলা পুলিশ, সিভিক ভলেন্টিয়ার এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা। কমিশনার জানিয়েছেন, পূর্ণার্থীদের ভিড়ের মধ্যেও সাদা পোশাকে পুলিশও উপস্থিত। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স এবং স্বাস্থ্য কর্মীরাও প্রস্তুত রয়েছেন। বহু মানুষের সমাগম হয় তাই রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। মাহেশ জগন্নাথ ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক সৌমেন অধিকারী জানিয়েছেন, রথের দড়ি শুরু টানা হয়েছে বিকেল পৌনে চারটে থেকে। শতাব্দী প্রাচীন এই রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের উন্মাদনার শেষ নেই। রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই আলো দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল মাহেশ জগন্নাথ মন্দির চত্ত্বর।

মন্দির সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বসেছে মেলা।  
কথিত রয়েছে শ্রীরামপুরের মহেশে এই রথের সূচনা করেছিলেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। ৬২১ বছর আগে শ্রী জগন্নাথ দেবকে ভোগ নিবেদন করার ইচ্ছে নিয়ে তিনি পুরীতে যান। গিয়ে ভিড়ের কারণে তিনি জগন্নাথ ঠাকুরের মন্দিরে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে আসেন।  তারপর স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী, গঙ্গায় ভেসে আসা নিম কাঠ থেকে তিনি তৈরী করেছিলেন জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার কাঠের মূর্তি। সেই মূর্তি আজও পুজো করা হয় বলেই জানা গেছে। তখন রথ কাঠের ছিল। পরবর্তী সময় কলকাতা শ্যাম বাজারের বসু পরিবারের উদ্যোগে মার্টিন এন্ড বার্ন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে তৈরী হয় ৫০ ফুট লম্বা নয়টি চূড়া বিশিষ্ট রথ। চারতলা রথের প্রতি তলায় রয়েছে লোহার রেলিং। সামনের দিকে রয়েছে বিশাল আয়তন দুটি তামার ঘোড়া। ১২ টি চাকা বিশিষ্ট এই রথের ওজন ১২৫ টন। তারপর থেকে প্রতিবছর পালিত হয়েছে এই উৎসব। ভারতের ধর্মীয় মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে ঋষি বঙ্কিম চন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত মাহেশের এই রথযাত্রা। ইতিহাস অনুসারে বহু ঋষি মনীষীর পাদস্পর্শে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এই রথযাত্রার। শ্রী চৈতন্য দেব, শ্রী রামকৃষ্ণ এবং মা সরদার পাদস্পর্শে ধন্য মাহেশের এই রথযাত্রা এই বছর ৬২২ বছরে পদার্পন করতে চলেছে। মহেশ জগন্নাথ ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক সৌমেন অধিকারী জানিয়েছেন, ‘‌রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার এই রথযাত্রা দেখতে মাহেশে এসেছিলেন।’‌ সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘‌এই বছর ভগবান শ্রী জগন্নাথের স্নান যাত্রার সময়ের পরিবর্তন করা হয়েছিল। কারণ প্রতি বছর স্নান যাত্রা হয়ে থেকে দুপুরে। হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন ওই স্নান যাত্রা দেখতে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর স্নানযাত্রা সম্পূর্ণ করা হয় পূর্ণিমার মধ্যে। এবছর পূর্ণিমা শেষ সকাল সাড়ে ৯ টায়, তাই সকাল ৮ টা ৪০ এর মধ্যে স্নান যাত্রা শেষ করে ফেলা হয়েছে।’‌

ছবি: সৌগত রায়।

জনপ্রিয়

Back To Top