সব্যসাচী সরকার- করোনার মোকাবিলায় রাজ্যে শুরু হল লকডাউন। সোমবার বিকেল ৫টা থেকে লকডাউন চলবে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত। ব্যস্ত শহর কলকাতা সোমবার সকাল থেকেই ছুটছিল। বিকেল ৫টায় নেমে এল এক স্তব্ধতা। দুপুরের পর থেকেই চেনা কলকাতার ছবিটা দ্রুত বদলাতে শুরু করল। ব্যস্ত গড়িয়াহাট, ব্যস্ত পার্ক স্ট্রিট–‌ধর্মতলা, ব্যস্ত বড়বাজার—‌ আসছে শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত আর কোনও ব্যস্ততাই নেই। ভাইরাস শত্রুর মোকাবিলায় কলকাতা যেন লড়াইয়ের শপথ নিল। লকডাউনের দিনগুলিতে সরকারি–বেসরকারি পরিবহণ বন্ধ থাকবে। রবিবার মধ্যরাত থেকেই সমস্ত লোকাল ট্রেনের যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সোমবার কলকাতার পার্শ্ববর্তী সমস্ত জেলা থেকে বিভিন্ন কাজে যে লাখো লাখো মানুষ শহরে আসেন, সেই ভিড় ছিল না। যাঁরা কলকাতা থেকে ফিরে যেতে পারেননি, তাঁরা সারাদিন যেভাবেই হোক ঘরে ফেরার দৌড়ে ব্যস্ত থাকলেন। বস্তুত সোমবার কাজের দিনের সকাল থেকেই ঘরে ফেরার দৌড় শুরু হয়েছিল। বিকেল ৫টায়ও সেই দৌড় থামল না। কেউ কেউ ফিরে যেতে পারলেন। হয়তো অনেকেই শহরেই রয়ে গেলেন আত্মীয়–বন্ধু–পরিচিতের বাড়িতে। আজ, মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাস্তায় সংবাদমাধ্যমের গাড়ি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনকারী সংস্থার গাড়ি চলবে। এ ছাড়াও খোলা থাকবে রেশন, মুদিখানা, সবজি, ফল, মাংস, মাছ, পাউরুটি ও দুধ বিক্রি এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহণ। খোলা থাকবে পেট্রোল পাম্প, রান্নার গ্যাস, তেল সংস্থার গোডাউন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহণ। সোমবার কলকাতা পুলিশের নগরপাল অনুজ শর্মা জানিয়েছেন, ‘‌নিয়ম প্রত্যেককেই মেনে চলতে হবে। অযথা, অকারণে রাস্তায় ঘোরাঘুরি চলবে না। প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’‌
দুপুর ২–‌৪৫ মিনিট 
চেনা গড়িয়াহাটের প্রায় সমস্ত দোকান একে একে বন্ধ হচ্ছে। আগেই বন্ধ রয়েছে কলকাতার নানা প্রান্তের ঝলমলে শপিং মল, সিনেমা হল। কিছু আগেই বন্ধ হয়েছিল বড় বড় দোকান। গড়িয়াহাটের ফুটপাথের যে হইহই বাজার তা যেন এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে থেমে গেল যখন বহুতলের পেছনে সূর্যের আলো পড়ে এল। শেষ দুপুরে টুকিটাকি বাজার সেরে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন। যানবাহন প্রায় নেই বলেই রাস্তা পার হতে গিয়ে, অতি সতর্ক থাকতে হচ্ছে না!‌
বিকেল ৪–‌২৫ মিনিট
গ্র‌্যান্ড হোটেলের নীচে দু’‌পাশে সারি দেওয়া দোকানপাট বন্ধ। দু’‌চারটে যা খোলা ছিল, ৫টার আগেই বন্ধ হয়ে গেল। পিচঢালা রাস্তার ওপর ফুচকা বিক্রেতা, একটু দূরে পান বিক্রেতার ছোট চৌখুপি বন্ধ হল। দু’‌ধরনের চা সারাদিন বিক্রি করেন সেই চা–‌বিক্রেতাও নিষ্কর্মা কুকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে স্টোভ হাতে হাঁটা দিলেন। পরে আবার দেখা হবে।
খানিক দূরেই শাটার নামল কে সি দাশের মিষ্টির দোকানে। ট্রাম লাইনের ওপর বিকেলের আলো। চারমাথার মোড়ে একদম ভিড় নেই।
বিকেল ৪–‌৫০ মিনিট
মেট্রো গলির সমস্ত শাটার বন্ধ। অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন, এ ক’‌দিন দোকানে রাখা যাবে না এমন কিছু জিনিসপত্র প্যাঁটরায় বেঁধে। এসপ্ল্যানেড–‌হাওড়া মিনিবাসের জানলায় মাত্র দু–‌চারটি মুখ।

 

ওদিকে ধর্মতলায় দূরপাল্লার বাসগুমটিতে যেন যুদ্ধ লেগেছে। বাসবোঝাই মানুষ ফিরে যাচ্ছেন দূরের জেলায়। বাসের ভেতরে তিল ধারণের স্থান নেই। তাই, পুঁটলি, ব্যাগ, হোল্ডঅল কোলে নিয়েই বাসের ছাদেই বসে যাওয়া। বহু মানুষকেই দেখা গেল উদ্‌ভ্রান্তের মতো এদিক–ওদিক ছুটছেন। আর কি বাস আসবে?‌
কাঁটায় কাঁটায় ৫টার সময় রেড রোড শূন্য। ক্যাসুরিনা অ্যাভেনিউ, লাভার্স লেন থেকে ফিয়ার্স লেনে নেমে এল স্থিরতা। যু্দ্ধ শুরুর আগে বোধহয় এমনই প্রতিজ্ঞার প্রহরে সবাই স্থির হয়।
শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, স্টেশন চত্বরের সামনে ব্যারিকেড করা আছে। সকালে মাইকে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছে, সতর্কতা নিয়ে। ট্রেন বন্ধ রয়েছে, এ কথাও জানানো হয়। হাওড়া স্টেশনেও মাইকিং করে বলা হয়েছে, সতর্ক থাকবেন।
আগেই বলা হয়েছে, খোলা থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান, ওষুধের দোকান। সেজন্য শেষ বেলাতেও দোকানে দোকানে ঠাসা ভিড় ছিল। প্রশাসনের নির্দিষ্ট করে দেওয়া গাড়ি ছাড়া আর কোনও গাড়ি ঘোড়া চলবে না। ঘোরাঘুরিও করা যাবে না রাস্তায়। নির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেরোলেই পুলিশ ধরবে। লকডাউনের নিয়ম না মানলে জেল–‌জরিমানা সবই হবে।
ঠিক বিকেল ৫টা
ট্রাফিক সিগনালে অনেক গাড়ি এসে থমকে গেল। ট্রাফিক পুলিশরা খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা বললেন। বিকেল ৫টার পরেও অনেকেই বাইক চালিয়ে বা হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছেন। কর্তব্যরত পুলিশ জিজ্ঞেস করছে, কোথায় যাচ্ছেন?‌ প্রয়োজনীয় সাহায্যও করছেন। আগামী শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত ৩০০ বছরের বেশি পুরনো কলকাতা শহরে থাকবে না গাড়ি, মানুষজন, মেলামেশা, ব্যবসা, চাকরি, প্রেম, সঙ্ঘাত।‌ দিনের শেষে দূরপাল্লার বাসে চেপে অনেকেই কয়েক দিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন। মন পড়ে রইল এই শহরে.‌.‌.‌‌

ওষুধের দোকানে ভিড়। গড়িয়াহাটে। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top