অরূপ বসু: জিম করবেটের লেখায় চম্পাওয়াত টাইগারের কথা পাওয়া যায়। ‘‌পথচারী বাঘ’টি ব্রিটিশ প্রশাসনের সব চেষ্টা ফাঁকি দিয়ে কুমায়ুনের জঙ্গলে দীর্ঘ দিন আতঙ্ক ছড়িয়ে ৬৬ জন মানুষ মারে। তার পর করবেটের গুলিতে প্রাণ দেয়। বাঘঘরায় বাঘটি সিমলিপালের জঙ্গল থেকে এসেছিল বলে মনে করেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য বনপাল প্রণবেশ সান্যাল। 
লালগড়ে বাঘটিকে দেখার ৬ মাস আগে ওডিশা বন দপ্তরের রিপোর্টে ছিল, সিমলিপালের জঙ্গলে বাঘের বৃদ্ধি ঘটেছে। জঙ্গলে বাঘ বাড়লে কোনও কোনও বাঘ নতুন অরণ্যভূমির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। রাতের অন্ধকারে কয়েক হাজার কিলোমিটার অরণ্য অতিক্রম করা তাদের কাছে কিছুই নয়। সিমলিপাল থেকে মেদিনীপুরে আসতে সুবর্ণরেখা ও কঁাসাই নদী পড়ে। হালকা জঙ্গলও আছে, যা বাঘের দরকার। বাঘের পক্ষে মেদিনীপুরের অভয়া বিট বা চারপাশের জঙ্গল খুবই আদর্শ। আদিবাসীরা কিন্তু শুরুতেই আভাস দিয়েছিল। বন দপ্তরের ব্যবস্থা নিতে একটু দেরি হয়েছে। তবে ড্রোন থেকে শুরু করে স্নিফার ডগ সব, ফরেস্ট প্রোটেকশন ফোর্সে যুক্ত করলে বাঘটিকে ধরা যেত। আতঙ্কিত জনতার রোষের শিকার হত না বাঘটি। 
সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে যৌথ বন্যপ্রাণ পরিচালনা সমিতি আছে। প্রণবেশবাবুর অনুমান, বাঘটি প্রথমে বিষাক্ত তীরে অবসন্ন হয়েছে। তার পর বল্লমের আঘাতে মারা গেছে। মেদিনীপুরের জঙ্গলে একটি বিষাক্ত ফল ‘‌stixycnos nuxvomica‌’‌ পাওয়া যায়। শিকার মরশুমে আদিবাসীরা তীরের ফলায় এই বিষ মাখিয়ে রাখে। বল্লমের আঘাতে বাঘ সহজে মরে না, যদি–‌না গলার নলি কেটে যায়। লালগড় থেকে চঁাদরা ৫ হাজার একর অরণ্যভূমি, এর মধ্যে বাঘ ঘুরে বেড়ালে তাকে ধরা বেশ কঠিন। 
‘আরণ্যক’ ছবির জন্য খ্যাত ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ধৃতিমান মুখার্জি জানাচ্ছেন, এক বার একটা ‘‌পথচারী বাঘ’‌ রণথম্ভোর থেকে গ্রাম–শহর এড়িয়ে ভরতপুর চলে গিয়েছিল। বাঘ এভাবেই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে। লালগড়ের ঘটনাটা নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের আগে কিছু বলা ঠিক নয়। 
মেদিনীপুরের বিধায়ক মৃগেন্দ্রনাথ মাইতির কথায়, ‘‌অনভিপ্রেত হলেও বাঘটি জনরোষের শিকার হয়েছে। বন দপ্তরের কাজে স্থানীয় মানুষ আস্থা রাখতে পারেননি। রাতেই খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।’‌ 
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ থেকে জানা যায়, এক আদিবাসী যুবকের গরু মেরে ফেলায় সে বটিলার মাথা থেকে তলায় ঘুমন্ত বাঘটিকে পাথর গড়িয়ে দিয়ে মেরে ফেলে। বছর ১৫–২০ আগেও সুন্দরবন–‌লাগোয়া গ্রামে ঢুকে–‌পড়া বাঘকে এলাকার মানুষ পিটিয়ে মারতেন। এখন সেখানে মানুষ বুঝেছেন, বাঘ মানুষ মারে না। তাই মানুষও আর বাঘ মারে না। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top