সোমনাথ নন্দী ও বুদ্ধদেব দাস,লালগড় ও মেদিনীপুর: লালগড়ের ভাউদির জঙ্গলে খাঁচার ফাঁদ এড়িয়ে গেল রয়্যাল বেঙ্গল। পাশাপাশি বাঘের পায়ের ছাপ মিলল মেদিনীপুর শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে মুড়াকাটা–কুয়াবুড়ির জঙ্গলে।
ভাউদির জঙ্গলে খাঁচা যেখানে বসানো হয়েছে তার পাশেই মাটির রাস্তা। সেই রাস্তায় বুধবার বাঘের পায়ের টাটকা ছাপ দেখে কপাল চাপড়াচ্ছেন বনকর্মীরা। রয়্যাল বেঙ্গলের পায়ের ছাপ দেখে মঙ্গলবার ভাউদির মধুপুরের জঙ্গলে বাঘ ধরার নতুন একটি খাঁচা বসিয়েছিল বন বিভাগ। সেই খাঁচা বাঘ এড়িয়ে যাওয়ায় এদিন আপশোস করতে থাকেন বনকর্মী থেকে বনকর্তারা। তাঁদের বক্তব্য, ‘‌একটুর জন্য শিকার ফসকে গেল‌।’‌ তবে গ্রামবাসীরা যা–‌ই দাবি করুন, বন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন লালগড়ের জঙ্গলে একটিই বাঘ রয়েছে। জানা গেছে, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটি এখন রয়েছে লালগড়ের কামরাঙ্গির জঙ্গলে। সাধারণের যাতায়াত ঠেকাতে লালগড়ের ভাউদি ফরেস্ট বিটের পুরো জঙ্গল এলাকা ব্যারিকেড করে দিয়েছে বন বিভাগ। জঙ্গলে ঢোকার রাস্তায় বড় বড় পাথর ফেলা হয়েছে।  
জঙ্গলে বাঘের খোঁজে গিয়ে বন বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মীরা অন্য বহু বন্য প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন। কামরাঙ্গি লাগোয়া আজনাশুলির জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৪৭টি দলমার হাতি। পাশেই জঙ্গলে ঘাপটি মেরে আছে ডোরাকাটা। তাই হুলা পার্টি ও বনরক্ষা কমিটির সদস্যরা হাতির দলকে তাড়িয়ে এলাকাছাড়া করতে পারছেন না। বাঘের ভয়ে জঙ্গলে ঢুকবেন না বলে হুলা পার্টির সদস্যরা জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে, মধুপুরের জঙ্গলে হাতির হামলায় যে দুটি ট্র্যাপ ক্যামেরা নষ্ট হয়েছিল তার মধ্যে একটি ক্যামেরাকে পাল্টে এদিন নতুন একটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে জানা যায়। সুন্দরবন থেকে আরও একজন বাঘ বিশেষজ্ঞকে লালগড়ে আনা হয়েছে। রয়্যাল বেঙ্গলকে খাঁচাবন্দি করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত হয়তো ঘুমপাড়ানি গুলিতে সংজ্ঞাহীন করে বন্দি করা হবে। সেজন্য বৃহস্পতিবার ট্রাঙ্কুলাইজার টিম আসছে লালগড়ে। এদিন মেদিনীপুর বন বিভাগের ডিএফও রবীন্দ্রনাথ সাহা বলেন,‘‌সব রকম পরিস্থিতির জন্য আমরা তৈরি আছি।’‌  তিনি এলাকার মানুষজনকে আতঙ্কিত না হওয়ার আবেদন জানান।  
অন্যদিকে, এবার বাঘের দেখা মিলেছে মেদিনীপুর শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে কনকাবতী গ্রাম পঞ্চায়েতের মুড়াকাটা–কুয়াবুড়ির জঙ্গলে। জঙ্গল–‌লাগোয়া গ্রামের মানুষজন মঙ্গলবার রাত ১০টা নাগাদ বাঘের গর্জন শুনতে পেয়ে বেরিয়ে এসে বাঘটিকে দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা খবর 
দেন বন দপ্তরে। ছুটে আসেন সুন্দরবন থেকে আসা বাঘ বিশেষজ্ঞরা। ততক্ষণে বাঘটি গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। সকালে কনকাবতী, মুড়াকাটা, কুয়াবুড়ি গ্রামের কাছের জঙ্গলে বাঘের পায়ের বেশ কয়েকটি ছাপ দেখতে পান বাসিন্দারা। বাঘ বিশেষজ্ঞরা পায়ের ছাপ সংগ্রহ করে আগের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। বনকর্মীরা জানিয়েছেন, এই এলাকায় একটি না একাধিক বাঘ রয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতেই বাঘের পায়ের ছাপ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। বুধবার শালবনির লক্ষ্মণপুরের জঙ্গলেও বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে। বনকর্মীরা জানান, মধুপুরের জঙ্গল থেকে লক্ষ্মণপুর হয়ে বাঘটি ধেড়ুয়ার শিয়ারবনি ও কনকাবতীর মুড়াকাটা, কুয়াবুড়ির জঙ্গলে যাতায়াত করছে। শিকারের খোঁজেই বাঘটি এই গভীর জঙ্গলের পথ বেছে নিয়েছে। প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গভীর জঙ্গল গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা। দিনের বেলাতেও ৩–‌৪ ফুট দূরের জিনিস দেখা যায় না। এরই পাশাপাশি লক্ষ্মণপুরের জঙ্গলে ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। খাঁচা বসিয়ে ফাঁদ পাতা হয়েছে। বনকর্তারা জানান, কোথাও বাঘ দেখা গেছে এই খবর পেয়েই অনেক উৎসাহী মানুষ, পর্যটক ছুটে আসছেন। এতে তাঁদের কাজে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য এদিন বিকেলে লক্ষ্মণপুরের জঙ্গলে বসানো খাঁচার চারপাশে তারের বেড়া লাগানো হয়েছে, যাতে বহিরাগতরা সাইকেল, মোটরবাইক চড়ে বা গাড়ি নিয়ে এই জঙ্গল পথে ঢুকতে না পারেন। বাঘের আতঙ্কে মার খাচ্ছে জঙ্গলঘেরা গ্রামের মানুষের কাজকর্ম। একশো দিনের কাজ থেকে রাস্তা তৈরির কাজ, গৃহহীনদের বাড়ি তৈরির কাজ, খাল, পুকুর কাটার কাজ বন্ধ। বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান দিনের বেলাতেই সারছেন মানুষজন। 
 

জনপ্রিয়

Back To Top