চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কেতুগ্রাম: ক্রোশ অন্তর দিঘি। আর হাঁক অন্তর মসজিদ। তার সঙ্গে সরাইখানা। প্রজাদের মনে দাগ কাটতে এই ছিল গৌড়ের নবাব হোসেন শাহর দর্শন। গৌড় থেকে মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান হয়ে যে প্রাচীনতম সড়কটি ওড়িশার গড়মান্দারণ ছুঁয়েছে, সেই সড়কের ধার বরাবর হাঁটলে হোসেন শাহর এই দর্শনের নজির আজও মেলে। বহু দিঘি হেজে–মজে গেলেও অনেক দিঘির জল এখনও কাকচক্ষু। সেই কালো জলে এখন আর কেউ তেষ্টা না মেটালেও মাছেদের রাজত্ব জমজমাট। স্নানও করেন। বহু মসজিদের নরকঙ্কাল বের হলেও সে–সবের গায়ে অপরূপ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ এখনও স্পষ্ট। 
বীরভূম, মুর্শিদাবাদ আর পূর্ব বর্ধমান, তিন জেলার সীমানায় কাটোয়ার কেতুগ্রাম ১ নং ব্লকের বেড়ুগ্রাম পঞ্চায়েতের কুলুট গ্রামের অপরূপ স্থাপত্যের নিদর্শ–বাহক মসজিদটি সংস্কারের অভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। এটিকে সংস্কার করার দাবি তুলছেন জেলার বিশিষ্ট মানুষজন। কাটোয়ার প্রাচীন মন্দির–মসজিদ নিয়ে গবেষণারত রণদেব মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘এটি মসজিদ না সরাইখানা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সুলতানি আমলের মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর সব উপাদান এই সৌধে না থাকার কারণেই এই সংশয়। তবে টেরাকোটার সূক্ষ্মতম কারুকর্ম, ভিত ও সরু ইটের গঁাথনি, পাথরের স্তম্ভ, খিলান প্রমাণ করে এককালে সৌধটির বিশালত্ব।’ দেখা গেল একটি বটগাছ তার ডাল–ঝুরি নিয়ে সৌধটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে। সৌধের দেওয়াল বহু জায়গায় খসে গেলেও দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকটা অনেকটাই অক্ষত রয়েছে। এখানকার সৌধের অলঙ্করণের সঙ্গে সুলতানি যুগের নিদর্শ মঙ্গলকোটের নতুনহাটের হোসেন শাহি মসজিদ বা মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির খেড়ুরের মসজিদের টেরাকোটার কাজ বা নির্মাণগত মিল রয়েছে বলে জানান রণদেববাবু। তবে এই সৌধটির সংস্কারের ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে বলে কাটোয়া মহকুমা প্রশাসন সূত্রে খবর।
এই স্থাপত্যের পাশে বিশাল দিঘিটি অবশ্য আজও জলপূর্ণ। দিঘির দক্ষিণ পাড়ে গড়ে উঠেছে একটি আবাসিক মাদ্রাসা। রয়েছে একটি খেলার মাঠ। কেতুগ্রাম এলাকাতেই হোসেন শাহ নির্মিত আরও দুটি দিঘি রয়েছে রাইখ্যা ও মজলিশপুরে। ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর বাংলার শাসক ছিলেন এই আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। মঙ্গলকোট ও কালনায় তঁার প্রশাসনিক কার্যালয়। তঁার আমলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, হিন্দুরা তঁাদের স্বাভাবিক ধর্মাচরণ করতে পারতেন। গৌড়–গড়মান্দারন সড়কটি এই হোসেন শাহ সংস্কার করেন। ব্যবসা–বাণিজ্যের সুবিধা ও সৈন্য চলাচলের পথ সুগম করাই ছিল সড়কটি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য। আর রাস্তার ধারে ধারে ক্রোশ অন্তর দিঘি খননের উদ্দেশ্য ছিল, কৃষিতে উৎপাদন বাড়িয়ে সেচসেবিত এলাকায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও পানীয় জলের জোগান অব্যাহত রাখা। বহু দিঘি আজও এলাকার বাসিন্দাদের নানা প্রয়োজন মেটাচ্ছে।

জনপ্রিয়

Back To Top