চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কাটোয়া: সকালের দরজায় হাজির মাছরাঙা / সুখ দেবে শান্তি দেবে জুড়বে কপাল ভাঙা।
একটি মাছরাঙা পাখিকে সঙ্গে নিয়ে এমন মঙ্গলবার্তা গঁায়ে গঁায়ে ছড়িয়ে দেন বাণী রায়। কাটোয়া ২ নং ব্লকের জগদানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের আখড়া গ্রামের এই রায় পরিবার বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। দুর্গার ভাসানের দিন বিষাদে মলিন মানুষের ঘরে ঘরে হাজির হয়ে পাখির মাধ্যমে সুখের বার্তা দেওয়ার এই প্রথাটি দীর্ঘকালের। জানালেন এলাকার সংস্কৃতিকর্মী গৌতম ঘোষাল, গৌরনাথ চক্রবর্তীরা। তঁাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল প্রথাটির কথা।
গাছের কাণ্ড–ডালপালা ঠুকরে ঠুকরে ভেতরের যত পোকামাকড় খেয়ে নেয় মাছরাঙা। তাই বহুকাল আগে আখড়া গ্রামের রায় পরিবারের সদস্যরা মাছরাঙা পাখিকে তেল–সিঁদুর মাখিয়ে বিজয়া দশমীর সকালে হাজির হতেন দরজায়। সংসারের মঙ্গলের জন্য গৃহস্থরা অপেক্ষা করে থাকতেন কখন রায়বাড়ির কেউ মাছরাঙা পাখি নিয়ে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। পাখির শরীরের তেল–সিঁদুরের কণা নিয়ে এয়োতিরা তঁাদের সিঁদুরের কৌটোয় ভরে রাখতেন। বিশ্বাস, তাতে সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হয়। এবারে মাছরাঙা পাখি নিয়ে ঘোরা রায় পরিবারের সদস্য বাণীদেবী বলছিলেন, ‘পূর্বপুরুষের প্রথা টিকিয়ে রেখেছি। সবচেয়ে কষ্ট হয় মাছরাঙা পাখি জোগাড় করতে। আগে যেমন এলাকার ঝোপঝাড়ে, গাছপালায় প্রচুর মাছরাঙা পাখি পাওয়া যেত, এখন গাছপালা অনেক কমে যাওয়ায় মাছরাঙা পাখি মেলাই দুষ্কর। বহু কষ্টে এই পাখিটাকে ধরেছি। সারা বছর উদ্বেগে থাকি, মাছরাঙা পাখি মিলবে তো!’
কাটোয়া মহকুমার প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানী রণদেব মুখোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, ‘বাঙালি মাছকে মঙ্গলের প্রতীক মানে। তেমনই এই এলাকার বাসিন্দারা মাছরাঙা পাখিকে কল্যাণের দূত বলে বিশ্বাস করেন। বহু জায়গায়  দশমী তিথি উদযাপনের পর যেমন নীলকন্ঠ পাখি মর্ত্যবাসীর কুশল বার্তা স্বর্গে পৌঁছে দেয় বা মঙ্গলের বার্তা ডানায় বেঁধে শঙ্খচিল ওড়ে, তেমনই আখড়া ও লাগোয়া এলাকা বিশ্বাস করে মাছরাঙা পাখি তাদের ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।’
দিনভর পাখি নিয়ে ‘শান্তি–কল্যাণ বিলিয়ে’ ঘোরার পর গোধূলি বেলায় ‘সুখপাখিটি’কে নিয়ে হাজির হতে হয় গ্রামের প্রান্তের মাঠে। তার পর মুক্ত করে দেওয়া হয় তাকে। হাওয়ার টানে ডানা ঝাপটে কোন দূরে ভেসে যায় মাছরাঙাটি। তখন খোলা মাঠের ‘উঠোন জুড়ে বইছে হাওয়া / কেবল আসা কেবল যাওয়া / অচিনপুরের পাখি’। আর সেই মাছরাঙার উড়ানের ছন্দে দাগা বোলায় এলাকার মানুষের বিশ্বাস, ‘শিস দিয়ে সে দিচ্ছে আশা / ছড়িয়ে দেবে ভালবাসা / সেই আশাতেই থাকি।’

জনপ্রিয়

Back To Top