চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়.পূর্বস্থলী: আচমকা হাসিখুশি ছেলেটাকে হারিয়ে বোবা হয়ে গেছে পূর্বস্থলীর ১ নং ব্লকের উত্তর শ্রীরামপুর ঘোষপাড়া। বুধবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ সহকর্মীর এলোপাতাড়ি গুলিতে প্রাণ হারান ভারত–তিব্বত সীমান্ত পুলিশের জওয়ান সুরজিৎ সরকার (২৭)–সহ ৫ জওয়ান। উত্তর শ্রীরামপুর গ্রামে ছত্তিশগড়ের সেই দুঃসংবাদ আসার পর হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। সেই সঙ্গে অপেক্ষা, কখন আসবে সুরজিতের দেহ?‌ তঁার বাড়িতে স্থানীয়দের ভিড়। ময়নাতদন্ত–সহ সমস্ত প্রক্রিয়া মিটিয়ে দেহ আসে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটে।
দেহ আসতেই সুরজিতের বাড়ির সদস্য ও এলাকার মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি দিলীপ মল্লিক সুরজিতের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। নবদ্বীপ শ্মশানে অন্ত্যেষ্টি হয় সুরজিতের। ছেলের শোক বুকে নিয়ে সুরজিতের মা পার্বতী সরকার বলেন, ‘সোমবার রাতেও ফোন করেছিল। বলেছিল, বাবা যেন ঘর তৈরির কাজে বেশি পরিশ্রম না করে।’ এসটিকেকে রোড লাগোয়া সুরজিৎদের বাড়ি। সেখানে একটা বাড়তি ঘর তৈরি হচ্ছে। সামনের বৈশাখে সুরজিতের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। এলাকার বাসিন্দা নবকুমার কর বলেন, ‘কেন যে এমন ঘটনা ঘটল বুঝতে পারছি না। সুরজিৎ এলাকায় খুবই জনপ্রিয় ছেলে ছিল। স্থানীয় রণচণ্ডী কালীপুজো কমিটির কর্ণধারও ছিল।’
কালীপুজোর ২ দিন আগে বাড়ি এসেছিলেন সুরজিৎ। ২৭ দিন ছুটি কাটিয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে যান তিনি। আবার আসার কথা ছিল বিয়ের আগে। তার বদলে বাড়িতে এল তঁার নিথর দেহ। জানা গেছে, বিদ্যানগর গয়ারাম দাস বিদ্যায়তন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কল্যাণীর একটি পলিটেকনিক কলেজে পড়তে পড়তেই আইটিবিপি–তে চাকরির পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন সুরজিৎ। অরুণাচল প্রদেশে ট্রেনিং পিরিয়ড সেরে প্রথমে ওডিশা, তার পর রাজস্থান ও তামিলনাড়ুতে কাজ করেছেন তিনি। গত দেড় বছর ধরে ছত্তিশগড়ের নারায়ণপুরে কর্মরত ছিলেন। সুরজিতের বাবা পেশায় তঁাতশ্রমিক পীযূষ সরকার। তিনি বলেন, ‘কারও সাতেপঁাচে থাকত না সেবক (সুরজিতের ডাক নাম)। সহকর্মীদের সঙ্গেও সদ্ভাব ছিল। তবু ওকে অকালে চলে যেতে হল!’ সুরজিতের এই অকালে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না উত্তর শ্রীরামপুর গ্রাম।
শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় কফিনের কাঠে বারবার কপাল ঠুকছিলেন সুরজিতের মা পার্বতীদেবী। আর আর্তনাদ করছিলেন, ‘পৃথিবীর কোনও মা–বাবাকে যেন এমন করে সন্তানের মৃত্যুমুখ দেখতে না হয়।’ সুরজিতের কফিন থেকে পার্বতীদেবীকে বিচ্ছিন্ন করতে কালঘাম ছোটে আত্মীয়–পড়শিদের।

মৃত জওয়ানের কফিন অঁাকড়ে শোকার্ত পরিবার ও পরিজন। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top