প্রদীপ দে, জঙ্গিপুর: হলধর মণ্ডল, বাড়ি খড়গ্রামে। দ্বারকা নদী পেরিয়ে মুড়ির ২–৩টি বড় বস্তা হাতে টানা ভ্যানে চাপিয়ে বিক্রি করেন গাঁয়ে গাঁয়ে। আপাদমস্তক কংগ্রেসি। দাদু, বাবার মতো হলধরও ভোট দেন কংগ্রেসকে। প্রণববাবুকে দিয়েছেন। তঁার পুত্র অভিজিৎকে দুবার দিয়েছেন। কিন্তু জঙ্গিপুর লোকসভার গ্রামের এই ভোটারটি এবার ভাবছেন কাকে ভোট দেবেন। হলধরের মতো এমন কংগ্রেসির সংখ্যা বহু। এরা ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে আছেন জঙ্গিপুরের ৭ বিধানসভার গ্রামে গ্রামে। তৃণমূল হলধরের মতো কংগ্রেসিদের ‘‌ভাবনা’‌কে হাতিয়ার করে এগোচ্ছ। এবং এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামে এর একটা ছায়াও পড়ছে। 
জঙ্গিপুর কেন্দ্রের একদিকে লাখ লাখ বিড়ি শ্রমিকের বসবাস। অন্যদিকে নবগ্রাম, সাগরদিঘি, খড়গ্রামের মতো রাঢ় এলাকার রুক্ষ মাটি। যে মাটি বরাবর ছিল সিপিএমের। মাঝে মাঝে কংগ্রেসের। সেই রুক্ষ মাটিতে এখন জোড়া ফুলের রমরমা। এককথায় একটি লোকসভায় দু–ধরনের রাজনৈতিক মাটি, তার মানুষদের জীবনচর্চা, সবকিছু আলাদা। ভোটেও তার প্রভাব পড়ে। এবারও পড়ছে। ২০০৪–‌এর আগে জঙ্গিপুর টানা দখলে ছিল সিপিএমের। প্রণব মুখার্জি প্রার্থী হওয়ার পর এখনও পর্যন্ত কংগ্রেসের। প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ছেলে অভিজিৎ মুখার্জি জয়ী হন দুবার। কিন্তু ২০১৪–তে ফারাক ছিল মাত্রর ৮ হাজার ১৪১, তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ১৮.৫৩ শতাংশ। কংগ্রেস ৩৩.৭৮ শতাংশ, সিপিএম ৩৩.৫ শতাংশ, বিজেপি ৮.৬৪ শতাংশ। তারপর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। এলাকার ৭ বিধানসভার মধ্যে, নবগ্রাম, খড়গ্রাম, জঙ্গিপুর, রঘুনাথগঞ্জ, সাগরদিঘি তৃণমূলের। সুতি আর লালগোলা কংগ্রেসের। পঞ্চায়েতে বিরোধীরা শূন্য। অঙ্কের হিসেবে তৃণমূল অনেকটা এগিয়ে একথা জঙ্গিপুরের সকলে বলছেন। কিন্তু ভোট সব সময় অঙ্ক মিলিয়ে হয় না। কাটাকুটি হয়। এখানেও চলছে কাটাকুটির অঙ্ক। কী রকম?  জঙ্গিপুর মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। সেই মতো কংগ্রেস বাদে প্রার্থীরাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এখানেই হচ্ছে কাটাকুটির অঙ্ক। যেমন বিজেপি প্রার্থী মাফুজা খাতুন দক্ষিণ দিনাজপুরের। হিন্দু বিজেপি কর্মীরা তাঁকে মেনে নেননি। তাহলে? মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অভিযোগ, ‘‌আরএসএস এখানে সরাসরি কংগ্রেসের হয়ে প্রচার করছে।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর এমন অভিযোগের যে সারবত্তা আছে, তা এলাকা ঘুরলেই মালুম হচ্ছে। আবার সিপিএমের একটা অংশের ভোট কংগ্রেস প্রার্থী পাবে বলে মনে করছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। নবগ্রাম, সাগরদিঘি, খড়গ্রাম— এই তিন বিধানসভায় সিপিএম প্রণবপুত্রের জন্য ‘‌কাজ’‌ করছে বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতা মন্ত্রী জাকির হোসেনের। যদিও সিপিএম জেলা সম্পাদক মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌তৃণমূল মিথ্যে প্রচার করছে। জুলফিকার আলি আমাদের প্রার্থী। সিপিমের ভোট ভাগ হবে না।’‌ 
এদিকে, কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ মুখার্জি বলছেন, ‘‌আমি সময় পেলেই জঙ্গিপুরে আসি। একটার পর একটা কাজ করেছি। কিন্তু সেসব প্রচার হয় না।’‌ আরএসএস যোগ নিয়ে প্রণবপুত্রের জবাব, ‘‌মুখ্যমন্ত্রী কেন এমন কথা বলছেন জানি না। অপপ্রচার করা হচ্ছে। মানুষই এই মিথ্যে প্রচারের জবাব দেবেন।’‌ শুধু আরএসএস যোগ নয়, মুখ্যমন্ত্রীর আরেক অভিযোগ, ‘‌কংগ্রেস প্রার্থী বসন্তের কোকিল। ৩৬৫ দিন দিল্লিতে থাকে। ভোট হলে আসে।’‌ সুতির বিড়ি মহল্লায় পা রাখলেই মুখ্যমন্ত্রীর কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় বিড়ি শ্রমিক রুস্তম আলি, মহসিন শেখদের গলায়, ‘‌৫ বছর আগে দেখেছিলাম। আর কোনওদিন দেখিনি।’‌ 
সুতি, রঘুনাথগঞ্জ, জঙ্গিপুরে লাখ লাখ বিড়ি শ্রমিক। মোট ১৬ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ভোটার বিড়ি শ্রমিক। মন্ত্রী জাকির নিজে বিড়িশিল্পের মালিক। তৃণমূল প্রার্থী খলিলুর রহমানও বিড়িশিল্পের মালিক। শ্রমিকদের সমস্যা, কেন্দ্রের বঞ্চনা জাকির, খলিলুররা জানেন। সহজে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে যান। খলিলুরের নির্বাচনী প্রধান জাকির বলেন, ‘‌নোটবন্দি, জিএসটিতে বিড়ি শিল্পে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের জন্য তারাপুরে কেন্দ্র শ্রম–হাসপাতাল করেছিল। গত ৫ বছর ধরে বেহাল হয়ে পড়ে আছে।’‌ জাকিরের দাবি, ‘‌এলাকায় যা কিছু কাজ হয়েছে সব মমতাদির উদ্যোগে। অভিজিৎবাবু বলতে পারবেন, কোন কাজটি তিনি করেছেন? করেননি। কন্যাশ্রী থেকে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা— সব রাজ্য সরকার করেছে।’‌ সাগরদিঘির তৃণমূল বিধায়ক, দলের জেলা সভাপতি সুব্রত সাহা বলেন, ‘‌আসলে মানুষ এখন তৃণমূলের সঙ্গে আছেন। কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি সকলে তলে তলে জোট বেঁধেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। কিন্তু সে আশা ওদের পূরণ হবে না।’‌ 
তাহলে কী অবস্থায় আছে জঙ্গিপুর? তৃণমূলের সংগঠন শক্ত জমির ওপর দাঁড়িয়ে। বিজেপি গোষ্ঠীকোন্দলে জর্জরিত। সিপিএমের সেই সংগঠন আর নেই। আর বাবার কাজের ‘‌ছায়ায়’‌ থাকা অভিজিৎ মুখার্জির সমস্যা হলধররা। এর ওপরে আছে অঙ্কের কাটাকুটি। তাহলে হাতে কী রইল? এটি লাখ টাকার প্রশ্ন।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top