গৌতম মণ্ডল, নামখানা, ৩০ মে- দুর্যোগের সময় প্রতিবেশীর পাকাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন গ্রামের শতাধিক মানুষ। ছিল ওরা দু’‌জনও। ঝড় থামার পর ফিরে এসে দেখেছিল বাড়ির চালা নেই। ঘরের ভেতরে জল‌কাদা মাখামাখি। ওদের বই‌খাতাও জলে ভিজে গিয়েছে। তড়িঘড়ি সেই বইখাতা নিয়ে কয়েক দিন ধরে শুকিয়ে নিয়েছে ওরা দু’‌জন। বাড়ির চালে লাগানো হয়েছে পঞ্চায়েতের দেওয়া তার্পোলিন। সপ্তাহ ঘুরে যাওয়ার পরও বিদ্যুৎ আসেনি। তবু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও ল্যাম্পের আলোয় ওরা শুরু করেছে পড়াশোনা। ওদের এখনও দুটি করে পরীক্ষা বাকি। ওরা দু’‌জনেই এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। করোনার জেরে লকডাউন শুরু হয়। তার পর বন্ধ হয়ে যায় পরীক্ষা। কিন্তু বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়ার জন্য প্রস্তুতিতে কোনও খামতি নেই ওদের। এই হার–না–মানা মানসিকতা ধরা পড়েছে মৌমিতা মিদ্দা ও অভিমন্যু বারুইয়ের মধ্যে।
বকখালি যাওয়ার পথে সাতমাইল বাস স্টপেজ। সেই স্টপেজ থেকে রাস্তার শেষ প্রান্তে হরিপুর নদীর বাঁধ। গ্রামের নাম শিবপুর। সেই বাঁধের ওপর বেশ কয়েকটি পরিবারের বাস। বাঁধ উপচে যাওয়া নোনা জলের দাগ এখনও দগদগে। অধিকাংশ কাঁচাবাড়ি। অধিকাংশ বাড়ির চাল উড়ে গিয়েছে। কয়েক হাত অন্তর শিকড় সমেত গাছ উপড়ে পড়ে আছে। দাঁড়িয়ে–থাকা গাছের পাতাও হলুদ হয়ে শুকিয়ে গিয়েছে। একটি মাত্র পাকাবাড়ি। আমফান আছড়ে পড়ার সময় গ্রামবাসীরা এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই রাতে সব প্রতিবেশীকে রান্না করে খাবারও দিয়েছিলেন ওই পরিবারের কর্তা। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। যুবকরা ভিন্‌রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যান।
মৌমিতা ও অভিমন্যু পড়ে স্থানীয় রাজনগর বিশ্বম্ভর হাই স্কুলে। দু’‌জনেই কলা বিভাগের পরীক্ষার্থী। দু’‌জনেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। মৌমিতা পরিবারের একমাত্র মেয়ে। বাবা দিনমজুর। স্থায়ী কোনও কাজ নেই। কিন্তু মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী। বাবা–‌মা দু’‌জনের কারও অক্ষরজ্ঞান হয়নি। কিন্তু মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে ভুল করেননি তঁারা। মৌমিতা বলছিল, ‘ঝড় থামার পর বাড়িতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। সব ভিজে গিয়েছিল। সেই ভিজে বইখাতা সব শুকিয়ে নিয়েছি। অ্যাডমিট কার্ডটা বাড়ির ট্যাঙ্কে রেখে দিয়েছিলাম। তাই কিছু হয়নি। পরীক্ষা দেবই। প্রস্তুতি নিচ্ছি।’‌
অভিমন্যুদের বাড়ি নদীবাঁধের কাছে। কেওড়ার জঙ্গলে ঘেরা চারপাশ। নদীর জল উঠোনে চলে আসে নিত্যদিন। এবার ঝড়ের সঙ্গে নদীর জলও ঢুকে গিয়েছিল ওদের বাড়িতে। সরকারি প্রকল্পে পাওয়া ইটের দেওয়ালের বাড়িটা কোনরকমে টিকে গিয়েছে। কিন্তু ছাউনি বলতে কিছুই ছিল না। বাড়ির চারপাশে ক্ষয়ে যাওয়া মাটি। বাবা অর্জুন বারুই রাজমিস্ত্রি। লকডাউনের শুরু থেকেই কাজ নেই। দুই ছেলের মধ্যে অভিমন্যু বড়। সে জানিয়েছে, ‘জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, সব এই নদীর পাড়ে। কয়েক মাস আগে বুলবুল হয়েছিল। তখনও এত ভয় পাইনি। এবার ঝড়ের দাপটে পাকাবাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। বাড়ির চাল বলে কিছু ছিল না। সব ভিজে শেষ। শুকিয়ে নিয়েছি। পরীক্ষা দেব। প্রস্তুতিও চলছে। ঝড় আমাদের দমাতে পারবে না!‌’‌

মৌমিতা মিদ্দা। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top