আজকালের প্রতিবেদন: সরকারি কাজে সময় নষ্ট একেবারেই চান না মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এ ব্যাপারে কড়া প্রশাসনিক মনোভাবেই চলতে চান তিনি। শুক্রবার মমতা বলেছেন, ‘‌সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময়ের অপচয় করা চলবে না। চার সপ্তাহের কোনও কাজ, সময় পেরিয়ে গেল— এটা চলবে না। এক মাসের মধ্যে শেষ করে উত্তর দিতে হবে।’‌ এদিন নবান্ন সভাঘরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রকল্পের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই সরকারি আধিকারিকদের উদ্দেশে ছিল তাঁর ওই মন্তব্য। মমতা আরও বলেন, ‘‌সারা দেশে মন্দা চলছে। বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গাড়ি শিল্পের অবস্থা খুব খারাপ। কেন্দ্রীয় সরকার ৪৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ করে দিচ্ছে। এই অবস্থায় শুধু ভাষণ দিলে হবে না। অর্থনীতির কথাও ভাবতে হবে।’‌ তাঁর মতে, ‘‌এই কঠিন পরিস্থিতিতেও চাকরি দিতে হবে নতুন প্রজন্মকে। কাজ দিতে হবে যুব সমাজকে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী তাই মনে করেন, ‘‌শিল্প গড়তে বাংলা এখন সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রচুর কাজের সুযোগ রয়েছে। তাই এই শিল্পক্ষেত্রে আরও জোর দিতে হবে।’‌
এদিনের অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রীদের মধ্যে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়, রাজীব ব্যানার্জি, লক্ষ্মীরতন শুক্লা, নির্মল মাজি–‌সহ সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জি, মুখ্যসচিব মলয় দে প্রমুখ। এছাড়াও বেশ কয়েকটি বণিকসভার শীর্ষকর্তা ও সরকারি আধিকারিকরা।
‌‌‌‌হাওড়ার ৯টি শিল্পতালুকে ১৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ও ২ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও এদিন জানিয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‌হাওড়া এক সময়ে ক্ষুদ্রশিল্পের পুণ্যভূমি ছিল। আমাদের সেই দিন ফিরিয়ে আনতে হবে। সমস্যার জট খুলতে খুলতে আমাদের এগোতে হচ্ছে। একসময় বাংলার নাম শুনলে শিল্পপতিরা মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এখন তাঁরাই নিজেদের মুখ সামনে আনতে চাইছেন।’‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন আরও বলেন, ‘‌সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের যেমন দায়বদ্ধতা আছে, সে রকমই শিল্পের প্রতিও দায়বদ্ধতা আছে। আমি চাই শিল্প হাসুক। কাজ যাতে তাড়াতাড়ি হয়, তার জন্য মেকানিজম তৈরি করতে হয়।’‌ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি অর্থমন্ত্রী ড.‌ অমিত মিত্রকে নির্দেশ দেন, শিল্প প্রকল্পে দমকলের দ্রুত ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য কী করা যায় সেটা দেখতে হবে। ৭–১০ দিনের মধ্যেই সমস্যা মেটাতে হবে। এক জানালা ব্যবস্থা চালু করতে হবে জেলায় জেলায়।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‌শিল্প করতে গেলে যে সব বিষয়ে লাইসেন্স দরকার হয়, যেমন দমকল, পরিবেশ— জমিসংক্রান্ত সব বিষয়ে যাতে একসঙ্গে ছাড়পত্র পাওয়া যায় তাও দেখবে সরকার। আমি জমি দিলাম, আরেকজন কোর্টে চলে গেল, তাহলে তো গোটা কাজটাই ধাক্কা খাবে। সেটা যাতে না হয়, আমাদের সবাইকে তাই আইনি বিষয় ভাল করে দেখে নিতে হবে।’‌  মমতার দৃঢ় বিশ্বাস, গ্রামের মানুষকে কর্মদিশা দেখাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

 
সম্প্রতি বানতলায় নতুন উদ্যোগে চর্মশিল্প তালুকের সূচনা করেছিলেন মমতা। সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতা এদিন বলেন, ‘‌ওই কর্মদিগন্তে ৫ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে। গড়ে উঠবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম চর্মশিল্প নগরী। তেমনি হাওড়াকেও আবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের শহর ‘‌শেফিল্ড’‌–‌এর সঙ্গে তুলনা করা হবে।’‌ এর আগে হাওড়া জেলার ৯টি শিল্প প্রকল্পের নাম ঘোষণা করেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগেও গড়ে উঠছে। যেমন ‘‌পশ্চিমবঙ্গ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশন’‌ জগদীশপুরে ১২০ একর জমির ওপর গড়ে তুলছে ‘‌হোসিয়ারি পার্ক’‌। ১ পাতার পর
মার্লিন গ্রুপের চেয়ারম্যান সুশীল মেহতা ‘‌সাউথ সিটি আনমোল ইনফ্রা পার্ক–‌এর বিপিও পর্যায়ের কাজ শুরু করল। সাঁকরাইলে শুরু হল ‘‌মাল্টি মডেল লজিস্টিক পার্ক’‌।
এদিকে, রাজ্যে কেউ কথায় কথায় গেট বন্ধ করে ঝান্ডা নিয়ে বসে পড়ুক— তাও চান না বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মালিক আর শ্রমিককে ‘‌মিলিয়ে’‌ দিতে চান তিনি। মমতা বলেছেন, ‘‌কারখানা বন্ধ হলে দু’‌পক্ষেরই ক্ষতি। ‌আমরা কেউ হিংসা, অশান্তির পক্ষে নই। শান্তি থাকলেই সব ঠিক থাকে। হিংসা, অশান্তির প্রতিযোগিতা নয়, কাজের বদলে কাজের প্রতিযোগিতায় নামুন। চারটে সম্প্রদায়ে যদি ভাগ হয়ে যান শ্রমিকরা, তাহলে কারখানায় কাজ হবে কী করে? সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন দিনকাল বদলেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে গেলে একসঙ্গে জোট বেঁধে নতুন নতুন আবিষ্কারের কাজে নামতে হবে।‌’‌ অর্থমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাবও দেন, এই সব ক্ষুদ্রশিল্প থেকে উৎপাদিত পণ্যর জন্য হাওড়া ও হলদিয়ায় রপ্তানিকেন্দ্র তৈরি করা দরকার।
অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র তাঁর ভাষণে বলেছেন, ‘‌এ রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে যত কর্মসংস্থান হয়, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। এই শিল্পে দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে এই রাজ্য। প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।’‌ এদিকে, এদিনই অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে খাদ্যদপ্তরের নতুন ভবন ‘‌খাদ্যশ্রী’‌ এবং পূর্ত দপ্তরের ৯০টি যাত্রী প্রতীক্ষালয় ‘‌প্রতীক্ষা’‌–রও উদ্বোধন করলেন মমতা। এছাড়াও স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ডিজিটাল পাবলিক লাইব্রেরির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন তিনি। ২১ হাজার ৫০০ বই এবং নথি রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। সাধারণ মানুষ এখন থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বইগুলি পড়তে পারবেন। ‌

 

নবান্ন সভাঘরে মুখ্যমন্ত্রী। পাশে অমিত মিত্র, অরূপ রায় । ছবি :‌ বিজয় সেনগুপ্তখাদ্যশ্রী ভবনের উদ্বোধনের পর মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। শুক্রবার। ছবি: তপন মুখার্জি

জনপ্রিয়

Back To Top