আজকালের প্রতিবেদন, গঙ্গাসাগর, ১৩ জানুয়ারি- পূর্ণিমার কোটাল চলছে। এইসময় সমুদ্রের জল বাড়ে। গত কয়েকদিনে গঙ্গাসাগরে জল বেড়েছে। রবিবার রাতে জোয়ারের জল উঠে যায় তটের অনেকটা অংশ জুড়ে। ভেসে গেছে তটের অস্থায়ী ছাউনিগুলি। মেলার ২ নম্বর রাস্তার পাশে কয়েকটি দোকানও জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সোমবার বেলা বাড়তে আরও একবার জলমগ্ন হয়ে পড়ে তটের বড় একটা অংশ। সেইসময় পুণ্যস্নানের জন্য আসা পুণ্যার্থীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসন। দড়ি দিয়ে সাগরের স্নানের পথ আটকে দেয় পুলিশ। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের স্পিডবোট চক্কর দিতে শুরু করে সাগরে। প্রায় ঘণ্টাখানেক এই জোয়ার চলে। 
এই জলোচ্ছ্বাস আগামী দিনের জন্য একাধিক আশঙ্কা তৈরি করে দিল বলে অনেকে মনে করছেন। গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্র ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সাগরের দ্রুত ক্ষয়ের কথা বলছিলেন। সাগর দ্রুত সমতলকে গ্রাস করছে। এদিন জোয়ারের জল নবনির্মিত কপিলমুনির মন্দিরের কয়েক‌শো গজের মধ্যে চলে আসে। তাতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সকলে। বর্তমান কপিলমুনির মন্দিরটি ষষ্ঠ মন্দির বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। সেক্ষেত্রে আগামী কয়েক বছর পরে কী হবে তাই নিয়ে চিন্তিত সকলে। 
রাজ্য সরকার গঙ্গাসাগর জুড়ে একাধিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়েছে। মন্দির লাগোয়া নাটমন্দির, ডালা আর্কেড গড়ে উঠেছে। তাই সর্বগ্রাসী সাগরের গ্রাস এড়ানোই এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। কপিলমুনির মন্দিরের রাস্তার শেষ প্রান্তে সাগরতটে চায়ের দোকান তপন দলুইয়ের। বেশ কয়েক বছর আগে অস্থায়ী ছাউনিতে চা–‌টিফিনের দোকান দেন তিনি। কিন্তু গত বছর বেশ কয়েকবার জলমগ্ন হয়েছে তাঁর দোকান। এদিন সকালে দোকানের ভিতরে গোড়ালির ওপরে সাগরের জল উঠে আসে। খরিদ্দারও পালিয়ে যায়। তঁার গলায় আক্ষেপ। বললেন, ‘কয়েকবার জল ঢুকল। অনেক দোকান ভাঙতে হয়েছে। আগে দেড় কিমি দূরে ছিল সমুদ্র। এখন প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। আগের কয়েকটি মন্দির তলিয়ে গেছে সমুদ্রগর্ভে। হয়তো এই মন্দিরও তলিয়ে যাবে। আমরা বড় বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছি।’‌ সাগরতটে কয়েক‌শো ভিখারি বসে থাকে রোজ। এদিন জোয়ারের জল আসায় পালিয়ে যায় তারাও। ভাটা পড়ার পর জায়গা নিয়ে মারামারি লেগে যায় তাদের মধ্যে। এক ভিখারি কাঁদতে কঁাদতে বলেন, ‘যেটুকু চাল, পয়সা জুটেছিল, সবটাই সাগরের জলে চলে গেল। জলের জন্য বসার জায়গাও কমেছে। প্রতিদিন ছোট হচ্ছে সাগরতট।’‌
সুন্দরবনের ভাঙন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ডিরেক্টর তুহিন ঘোষ। তিনিও উদ্বিগ্ন। বললেন, ‘‌গঙ্গাসাগর 
একটি দ্বীপ। পাশের ঘোড়ামারা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। লোহাচড়া ও বেডফোর্ড দ্বীপ তলিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে ভাঙন বেড়েছে। একসময় প্রচুর বালিয়াড়ি ছিল। কিন্তু এখন সেগুলি নেই। নদীবাহিত পলি সমুদ্রে যতটা জমা হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। ফলে সমুদ্রে খাবারের অভাব হচ্ছে। আগামী দিনে ভাঙন আরও বাড়বে। তাই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’‌‌‌‌

জলমগ্ন গঙ্গাসাগরের তটে কাজ করছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল। ছবি:‌ অভিজিৎ মণ্ডল
 

জনপ্রিয়

Back To Top