গৌতম মণ্ডল, গঙ্গাসাগর: মাহেন্দ্রক্ষণের কাউন্টডাউনেই মানুষের ভিড়ে রেকর্ড গড়ার পথে গঙ্গাসাগর। সোমবার বিকেল থেকে ভিড় একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগে তা টের পাওয়া গেল। সাগরমেলায় ঢোকার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর রাস্তা দিয়ে মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়ল সাগরে। অন্যদিনের তুলনায় এদিন ভোরে ঠান্ডার কামড়টা অনেক কম ছিল। উত্তুরে হাওয়ার দাপট প্রায় ছিল না বললেই চলে। বেলা গড়িয়ে সন্ধের পরও ভিড় অব্যাহত। কাকদ্বীপের লট নম্বর আট থেকে প্রচুর পুণ্যার্থী মেলায় ঢোকার অপেক্ষায়। বুধবার ভোর থেকে শুরু মকর সংক্রান্তির পুণ্যযোগ। 
কপিলমুনি মন্দির সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৮টা ২৪ মিনিট থেকে শুরু হবে এই যোগ। চলবে পরদিন বেলা পর্যন্ত। কিন্তু মঙ্গলবার দিনভর মানুষের ভিড়ে জমজমাট গঙ্গাসাগর। দিনভর একদিক থেকে পুণ্যার্থীরা ঢুকেছেন মেলায়। অন্যদিকে স্নানের পর কপিলমুনি মন্দিরে পুজো দিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। কপিলমুনি মন্দিরের সামনে ২ নম্বর রাস্তায় একাধিক ড্রপগেট করা হয়েছে। সেই ড্রপগেটে দিনভর পুণ্যার্থীদের ভিড় লেগেছিল। পুলিশ ও প্রশাসন নির্বিঘ্নে পুণ্যার্থীদের ভিড় সামাল দিয়েছে। বিকেলে মেলা অফিসে সাংবাদিক বৈঠকে মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি বলেন, ‘৩১ লক্ষ পুণ্যার্থী ইতিমধ্যেই স্নান সেরেছেন। এবার সব মিলিয়ে ৪৫ লক্ষ পুণ্যার্থী স্নান করবেন বলে অনুমান। সমস্ত পরিকাঠামো তৈরি আছে।’‌‌ মকর সংক্রান্তির পুণ্যক্ষণের আগে ১৪ জানুয়ারি সাগরস্নানের রীতি দীর্ঘদিনের। অন্য বছরগুলিতে এই তারিখে মকর সংক্রান্তি হয়। ফলে এই দিনটিও পুণ্যার্থীদের কাছে পুণ্যক্ষণ। সেই ছবি ধরা পড়ল এদিন। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী স্নান সেরেছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও গ্রামীণ ভারত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মিলেছে বিশ্বাস ও পরম্পরা। কলেজপড়ুয়া টপ–জিনস পরা তরুণীও স্নান সেরেছেন সাগরে।
উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়া থেকে এসেছে দুবে পরিবার। দুই কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে এসেছেন পরিবারের সদস্যরা। কোনওদিন নদী বা সাগরে স্নানের অভিজ্ঞতা নেই তাঁদের। এদিন হাঁটুসমান জলে নেমে স্নান সারেন। স্নানের পর আনন্দ ধরে রাখতে দুই বোনের ছবি ধরা থাকল মোবাইলের সেলফিতে। দুই বোন অঞ্জলি ও মহিমা জানালেন, ‘‌বাবা–‌মা আসছিল। আমরাও চলে এলাম। তার আগে সোশ্যাল সাইট থেকে সব দেখে নিয়েছিলাম। খুব আনন্দ হচ্ছে। এত মানুষ এখানে স্নান করছে ভেবে আলাদা অনুভূতি হচ্ছে। স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই দিন।’‌ দুবে পরিবারের পাশেই দেহাতি মানুষের ছড়াছড়ি। পোশাক, কথাবর্তায় তা স্পষ্ট। বিহারের মাধেপুরা থেকে জনা পঞ্চাশের দলটি স্নানের আগে কোরাসে ভোজপুরিতে সূর্যপ্রণাম সেরে নেন। তার পর এগিয়ে চলেন সাগরের দিকে। পুজো সেরে সাগরতটে ধূপ, ধুনো, মোমবাতি দিয়ে একপ্রস্থ আরতি চলে। অনেকে আবার সটান তটে শুয়ে পড়লেন। স্নানের পর এবার পুজোর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া। দলের পান্ডা রামকিশোর শাহ বলেন, ‘সাগরের পাশাপাশি কলকাতা ঘুরে দেখব আমরা। আমরা গ্রামে চাষবাস করি। সারা বছর টাকা জমিয়ে এখানে এসেছি। অনেক শুনেছি সাগরের কথা। এসে খুব ভাল লাগল। টাকা জোগাড় করতে পারলে আবার আসব।’‌
এবারের মেলায় এখনও পর্যন্ত কোন মৃত্যুর খবর নেই। নেই কোন দুর্ঘটনার খবরও। এদিন শিউপূজন শর্মা নামে উত্তরপ্রদেশের এক পুণ্যার্থীকে অসুস্থ অবস্থায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বিঘ্নে চলছে মেলা। বুধবার প্রশাসনের তৎপরতা আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশমতো দুর্ঘটনাহীন মেলা উপহার দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন।‌

জনপ্রিয়

Back To Top