Exclusive Durga Puja 2022: দুর্গা গয়না পরতে আসেন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে

পল্লবী ঘোষ: শাস্ত্র মতে, দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ।

সপ্তলোকে তাঁর আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই, আনন্দ-মগ্ন সকলে। তারই আঁচ পাওয়া গেল জোড়াসাঁকোয়। শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়িতে। দালান জুড়ে 'শরৎ- আলো'। লাল দালানের মাঝে আলপনা। দেবীর মাটির মূর্তি মাঝে। বনেদি বাড়ির কোণায় কোণায় তখন মনভোলানো সুবাস। যদিও চেনা গন্ধ। বাড়ির অন্দরমহলে তখন জোরকদমে চলছে নারকেলের নাড়ু বানানোর প্রস্তুতি। লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে সেজে বাড়ির মহিলা সদস্যরা এই কাজে সামিল। তাঁদের সহায়তা করছেন আরও কয়েকজন। এক সদস্যাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ৭০টি নারকেল কুড়নো হয়েছে। দেড় হাজার নাড়ু তৈরি হবে। কোনওটা গোল, কোনওটা আবার ত্রিকোণাকৃতি। থরে থরে সাজানো একটি ঘরে। এই সবটাই ষষ্ঠী থেকে দশমীতে মাকে নিবেদন করা হয়। 

কথিত রয়েছে, কলকাতায় পা রেখেই দুর্গা গয়না পরতে আসেন শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে। খাবার খেতে যান মিত্র বাড়িতে। আর রাত জেগে নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে। কলকাতায় দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার কয়েক বছর পর প্রতিমার সাজ আসত জার্মানি থেকে৷ ডাক মারফত এদেশে সেই উপকরণ আসায় বলা হত ডাকের সাজ৷ সেই সাজের এখনও দেখা মেলে কলকাতার কোনও কোনও বনেদি বাড়িতে৷ প্যারিস ও জার্মানি থেকে সোনালি রঙের ধাতুর সরঞ্জাম এনে বিশেষ গয়না গড়ানো হত দাঁ বাড়ির উমার জন্য। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই ডাকের সাজ কলকাতায় আসত৷ এখনও শিবকৃষ্ণ দাঁ-এর বাড়ির চালচিত্রে মিশ্র ধাতুর জার্মান তবক ব্যবহার করা হয়৷ ১৮৪০ সাল থেকে দুর্গার আরাধনা শুরু হয় এই বাড়িতে। ১৮২ বছরের পুরনো পুজোয় দেবীর সাজে যেমন সাবেকিয়ানার ছোঁয়া, তেমনই গা জুড়ে থাকে ভারী গয়না। আধুনিক নকশা করা গয়নাও পরানো হয় মাকে। 

বাড়ির সদস্য প্রিয়ব্রত দাঁ বললেন, 'বৈষ্ণব রীতিতে পুজো হয় শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়িতে। অন্নভোগ নিবেদন করা হয় না। পুজোর ভোগ প্রসাদে থাকে লুচি, মিষ্টি, পান্তুয়া, খাজা, গজা, মিহিদানা, সন্দেশ। বেশিরভাগ মিষ্টি বাড়িতেই তৈরি হয়।' বৈষ্ণব হলেও সিংহের মুখ ঘোটকাকৃতির হয় না। তবে সিংহ শ্বেত বর্ণের। এ বাড়িতে বলির প্রচলন নেই। তবে ধুনো পোড়ানো, কুমারী পুজোর প্রচলন আছে। 

প্রতিপদে পুজো শুরুর পর থেকে নবমী পর্যন্ত নিরামিষ আহার করেন বাড়ির সদস্যরা। দশমীতে হেঁশেলে আমিষ রান্না হয়। বিসর্জনের আগে মাছ-ভাত মুখে তুলে, তারপর মাকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণেও এই বাড়ির রীতি-রেওয়াজ একেবারে চোখ ধাঁধানো। সন্ধিপুজোয় মাকে ১০৮ প্রদীপ ও ১০৮ পদ্ম ছাড়াও ৪০ কিলো চালের নৈবেদ্য অর্পণ করা হয়। এই সন্ধিপুজোর পুরো আয়োজন করেন বাড়ির পুরুষেরা। ছোট থেকে বড় দুই প্রজন্ম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামিল হন পুজোর কাজে। 

বাড়ির রেওয়াজ অপরিবর্তিত। এক মাস আগে থেকে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। মিষ্টি তৈরি শুরু মহালয়ার আগে থেকে। কাজের বিপুল চাপ থাকলেও, চোখে-মুখে উন্মাদনা। উমা আসছেন একবছর পর। এবার আর করোনা-আতঙ্ক নেই। বিদেশ থেকে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও পা রাখবেন দালানে। সবমিলিয়ে, আবেগপ্রবণ সকলে। পুজো শুরুর আগেই যেন আনন্দধারা দাঁ বাড়ির ভুবনে বইছে। 

আকর্ষণীয় খবর