আজকালের প্রতিবেদন: গেরুয়াবাহিনীর তাণ্ডবের প্রতিবাদে পড়ুয়াদের মিছিলে উত্তাল হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। শুক্রবারের এই মিছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, বিজ্ঞান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং— তিনটি শাখার পড়ুয়ারাই শামিল হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, অরবিন্দ ভবনের সামনে জড়ো হয়ে দু নম্বর গেট দিয়ে মিছিল বেরোয়। গোলপার্ক পর্যন্ত যায় এবং সেখান থেকে ফের মিছিল ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। মিছিলেন পা মেলান অনেক শিক্ষকও। এদিন এসএফআইয়ের পক্ষ থেকেও ঢাকুরিয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল করা হয়। যাদবপুরের পড়ুয়াদের সমর্থনে পথে নামেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও। 
যাদবপুরের পড়ুয়াদের মিছিলে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বক্তব্য, ‘‌শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি দখলের জন্য এবিভিপি আঘাত হানলে, পাল্টা আঘাত তাদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’‌ মিছিলে লেখা পোস্টারগুলির মধ্যে কোনওটায় লেখা ছিল ‌ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস এবং চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কোনওটায় লেখা ছিল ‘‌এনাফ’‌ কোনওটায় লেখা ছিল এনআরসি মানছি না। 
বৃহস্পতিবার রাতেই আমরি হাসপাতালে ভর্তি হন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস এবং সহ উপাচার্য প্রদীপ ঘোষ। এদিন তাঁদের দেখতে হাসপাতালে যান রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু এবং শিক্ষক সমিতি জুটা–‌র সদস্যরা। আপাতত দুজনের শারীরিক অবস্থাই স্থিতিশীল। পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন উপাচার্য। এদিন শিক্ষকরা তাঁকে বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে আর না ভাবতে। উপাচার্যের সঙ্গে রাজ্যপালের ব্যবহার তাঁরা সমর্থন করেন না, শিক্ষকরা তাঁর পাশে আছেন। 
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে এদিন আরও একবার জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁরা ক্যাম্পাসে পুলিশ ডাকায় বিশ্বাস করেন না। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রেজিস্ট্রার  যে প্রেস বিবৃতি দেন তাতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র ক্যাম্পাসে আসাকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ঘটনা যে ঘটতে পারে তার আগাম ধারণা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবারই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। ওই গন্ডগোলের সময় প্ররোচনা এবং উসকানিমূলক আচরণের নিন্দা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে ক্যাম্পাসে রাজ্যপাল থাকাকালীন যে ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা দুর্ভাগ্যজনক। রাজ্যপালের গাড়ি আটকানো বিশ্ববিদ্যালয় সমর্থন করে না। রাজ্যপালের গাড়ির সামনে বসে পড়া পড়ুয়াদের পুলিশ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কর্মীরাই বুঝিয়ে ওঠান। পড়ুয়াদের বোঝানোর সময়ই উপাচার্য এবং সহ উপাচার্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। যে ভাষায় এবং ভঙ্গিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপাচার্যের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা বলেন, জুটা–‌র পক্ষ থেকে তার নিন্দা করা হয়েছে। জুটা–‌র বক্তব্য, পড়ুয়াদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বেশ কিছু আচরণ ও মন্তব্য প্ররোচনামূলক ছিল। যার ফলে অবস্থা জটিল হয়। তবে ছাত্রদের আরও সংযত থাকা উচিত ছিল। বাবুলের অভিযোগ, তিনি আসবেন জেনেও বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি। যা নিয়ে এদিন রেজিস্ট্রার বলেন, ‘‌অনুষ্ঠানটি করার জন্য অনুমতি চেয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল তাতে বাবুল সুপ্রিয়র নাম ছিল না। পরে তাঁর নাম লিখে পড়ুয়াদের পক্ষ থেকে একটি চিরকুট অফিসে দেওয়া হয়েছিল। যা আমি দেখিনি। কারণ অনুষ্ঠানের অনুমতি আগেই দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অনুষ্ঠানে উনি আসেননি। তা–‌ও যথেষ্ট সংখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীরা ছিলেন।’‌ 
বৃহস্পতিবার রাতে এবিভিপি–‌র গুন্ডাবাহিনী কলা বিভাগের ইউনিয়ন রুমটি পুরো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। লাল রং দিয়ে ইউনিয়ন রুমের দেওয়ালে লিখে দেওয়া হয়েছিল এবিভিপি। ইউনিয়ন রুমের ভেতরের দেওয়ালে আঁকা ররীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং চে গেভারার গ্রফিতিতে রঙের পোঁচ দিয়ে দেয় হামলাকারীরা। দেওয়ালে আঁকা লেনিনের ছবিও নিস্তার পায়নি। ইউনিয়ন রুমে থাকা আলমারি, কম্পিউটার, আলমারির ভেতর থাকা পড়ুয়াদের গিটার, বই, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র— কিছুই রেহাই পায়নি। শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন রুমটি পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছে। দেওয়াল ঘষার কাজও শুরু হয়েছে যাতে নতুন করে রং করা যায়। ইউনিয়ন রুমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের প্রায় গায়েই। এই গেটের তালা ভেঙে ঢুকেছিল হামলাকারীরা। এ নিয়ে রেজিস্ট্রার বলেন, ‘‌বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন রুমটি ঠিক করে দেওয়া হবে। যে তালাগুলি ভাঙা হয়েছে সেগুলি সারাই করা হচ্ছে।’‌ 
ইউনিয়ন রুম থেকে একটু এগিয়েই ইউজি আর্টস ব্লিডিং। একতলায় ডিন অফ আর্টসের দপ্তর। তার সামনে প্রত্যেকটি নোটিস বোর্ডের কাচ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ভাঙচুর করা হয়েছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জুটা। জুটার সাধারণ সম্পাদক পার্থপ্রতিম রায় বলেন, ‘‌গেটের পাশের দোকানেও হামলা হয়েছে। দোকানি আহত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে একটি সংগঠনের নাম লিখে দেওয়া হয়েছে। ওদের আক্রমণে ক্যাম্পাসের ভেতর অনেক পড়ুয়া আহত এবং রক্তাক্ত। ঘটনার সময় এবং পরে একদল পড়ুয়াকে চিহ্নিত করে হামলা চালানো হয়েছে। আমরা এই গুন্ডামির তীব্র নিন্দা করছি। কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’‌

এবিভিপি সন্ত্রাসের প্রতিবাদে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মিছিল। শুক্রবার। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top