অমিতাভ সিরাজ ■  রায়গঞ্জ- কয়েক কলি ভাসছিল হাওয়ায়—‘‌আপন জন্মের কথা কে জানে রে ভাই, সকল ভেদ সেই তো জানে তার তুলনা নাই.‌.‌.‌।’
বাহ্‌, এ তো বাউল–‌ফকিরের গান?‌
—বটেই তো।
এমনভাবে বললেন, যেন কতদিনের চেনা!‌
মেঠো পথ ধরে গাইতে গাইতে আসছিলেন ওঁরা। কাঁধে ঝোলা। শরীর মুড়ে আলখাল্লায় ঢাকা। মুখে বলিরেখা স্পষ্ট গোপাল বর্মনের। আর তাঁর স্ত্রী জ্যোৎস্না‌। সুমধুর কণ্ঠস্বর তাঁর!‌
—আমি কীর্তন দলেও গান করি। তবে সবই তো মাটির গান, কী বলেন?‌
হাসলেন জ্যোৎস্না। লোকশিল্পী। ভাতাও পান রাজ্য সরকারের। স্বামী গোপাল বর্মন খোলবাদক। রাজবংশী এঁরা।
জায়গাটার নাম ‘‌বিন্দোল’‌। বর্ডার এলাকা। দেশভাগের ক্ষত নিয়ে দুই বাংলা এখানে কাঁটাতারের বেড়ায় আলাদা হয়ে আছে। এখানেই মৌজগাঁয়ে বাড়ি এই লোকশিল্পীদের। কথা বলার ফাঁকে আরও কয়েকজন জড়ো হয়ে গেলেন।
টিনের চালার নীচে চায়ের দোকান। তাকে ঘিরে হাট বসেছে বিন্দোলে। পাশ দিয়ে কাঞ্চন নদী বয়ে গেছে। দেশভাগের আগে বন্দর ছিল এখানে। বজরা চলত। নোঙর ফেলত পাট ব্যবসায়ীরা। নদীর পাড়ে বসতি গড়ে ওঠে। বন্দরিওয়ালা— অপভ্রংশে বিন্দোল হয়ে যায়। রাজবংশী ও মুসলিম জনসংখ্যা মূলত বেশি এখানে। বালিয়া হাটের গা–‌ঘেঁষে যেন ইতিহাস দাঁড়িয়ে। একদিকে ‘‌পাঁচ পিরের দরগা। অন্যপ্রান্তে বালি রাজার দুর্গ—খণ্ডহর হয়ে পড়ে আছে। পেছনে ১৭ বিঘার বিশাল দিঘি।
এখন কাঞ্চন নদী শুকিয়ে কাঠ!‌ কিন্তু ‘‌ট্র‌্যাডিশন’‌ সমানে চলেছে— হাটেবাজারের সেই চালচিত্র। চায়ের আসরে জোর তর্ক–‌বিতর্ক। বোঝা যাচ্ছে রায়গঞ্জে ভোটের পারদ তুঙ্গে। তা সে শহর হোক কিংবা গাঁ–‌গঞ্জ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যে–‌যার মত নিয়ে চায়ের কাপে তুফান উঠছে প্রার্থীদের সমর্থনে। 
‘‌কই হে গান ধরো।’‌ বালিয়া হাটের ওই আড্ডার মেজাজেও কেউ যেন বলে উঠল পয়লা বৈশাখের দুপুরে। মেঘলা, চমৎকার আবহাওয়া।
লাজুক হাসলেন জ্যোৎস্না। বললাম, ‘‌কোন দলের হয়ে প্রচারে যাচ্ছেন?‌’‌ পাশ থেকে গোপাল বর্মনের আগ বাড়িয়ে জবাব, ‘‌বুঝলা না, হ, আমরা মাটির গানই তো গাই।’‌ ওঁর কথা শুনে হেসে উঠলেন সবাই। কোন দল—ইঙ্গিতটা বিলক্ষণ চেনা। মমতা লোকশিল্পের প্রসারে এঁদের জন্যই তো মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ভোটবাক্সে তারও সুফল মিলবে আশা তৃণমূলের। বিন্দোলে আসার আগে হেমতাবাদ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়েও দেখছিলাম, দিব্যি খোশমেজাজে আড্ডার মুডে কর্মী–‌সমর্থকরা। গোয়ালপোখর, ইসলামপুর, চাকুলিয়া চষে বেড়াচ্ছেন সেলিম, দীপা, দেবশ্রী—মমতা–‌বিরোধী তিন প্রার্থী। সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি–‌র সঙ্গে তৃণমূলের চতুর্মুখী লড়াই দেখছেন রায়গঞ্জ লোকসভার ভোটাররা। পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছর আগের ভোটে সিপিএমের মহম্মদ সেলিমের ঝুলিতে বেশি ছিল মাত্র ১৬৩৪ ভোট। জয়ী হন তিনি। প্রিয়পত্নী দীপা দাসমুন্সির অনুগামীদের ধারণা, এবারে তাঁদের লড়াই যত না বাম বা তৃণমূল কংগ্রেস, তার চেয়েও বেশি বিজেপি–‌র সঙ্গে। কারণ, এই ভোট দিল্লির ভোট। মোদির বিরুদ্ধে স্থায়ী সরকার গড়তে পারে কংগ্রেসই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা বোঝাচ্ছেনও দীপা। সঙ্গে ছেলে মিছিলও। প্রয়াত প্রিয়রঞ্জনের ছায়ায় লড়ছেন দীপা। হুডখোলা গাড়িতে, কখনওবা হেঁটে সকাল–‌সন্ধে প্রচার করছেন। সেলিমের জমি পুনরুদ্ধারে ভরসা চাকুলিয়া ও হেমতাবাদ বিধানসভা কেন্দ্র। যা ফব ও সিপিএমের দখলে। সেলিম বোঝাচ্ছেন, কেন্দ্রে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মোদির আমলে কতটা দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে মানুষকে। বিজেপি–‌র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে বামেদের লড়াইকে সামনে আনছেন।
বাকি ৫ বিধানসভার মধ্যে রায়গঞ্জ ও কালিয়াগঞ্জ কংগ্রেসের দখলে, ইসলামপুর, করণদিঘি ও গোয়ালপোখর তৃণমূলের। শুধু তাই নয়, এই মুহূর্তে রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ ও ইসলামপুর পুরসভাতেও ক্ষমতায় তৃণমূল। জেলা পরিষদ থেকে পঞ্চায়েত স্তরেও সিংহভাগ তাদের। সবমিলিয়ে ভোটের হাওয়া যে ‘‌অনুকূল’‌ তা দৃঢ় বিশ্বাস মমতার রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালের। পেশায় আইনজীবী ও ইসলামপুর পুরসভার চেয়ারম্যান কানাইয়ালাল তাই বলেন, ‘‌বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগে উন্নতি যে হয়েছে তা প্রমাণিত। নতুন করে কীইবা বলার আছে?‌ আমি শুধু সেই কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে ভোট চাইছি।’‌ তৃণমূলের উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি অমল আচার্যের কথায়, ‘‌অনেকগুলি প্লাস পয়েন্ট আমাদের। যা ভোটবাক্সে এগিয়ে রেখেছে। মমতার উন্নয়ন ভাবনা সমাজের সবস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছেছে। শুধু এটাই বা ভাবছেন কেন, ৪২ আসনই তো আমাদের লক্ষ্য।’‌ তৃণমূলের ভোটপ্রচারেও তাই উঠে আসছে রায়গঞ্জের নতুন মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের কথা।
রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক দীপকচন্দ্র বর্মন বলছিলেন, ‘‌প্রান্তিক মানুষের উন্নতি হলে সমাজেও তার ছাপ পড়ে। যেমন শিল্পীদের আর্থিক সাহায্য বড় পদক্ষেপ নিশ্চয়। সামাজিক উন্নয়নের প্রতিফলন ভোটেও পড়ছে।’‌ 
উত্তর দিনাজপুরের এই আসনটি মোদির দলও পাখির চোখ করেছে। দাঁড় করিয়েছে দেবশ্রী চৌধুরিকে। বালুরঘাটে বাড়ি। সঙ্ঘ পরিবারে বেড়ে ওঠা, সক্রিয় কর্মী। রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রে এবারে ১৪ জন প্রার্থী। মায়াবতীর বিএসপি, কেপিপি থেকে নির্দলও রয়েছেন। দেবশ্রী ততটা পরিচিত মুখ না–‌হলেও বিজেপি–‌র কাছে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে দাড়িভিট স্কুল–‌কাণ্ড। দুই ছাত্রের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাকে গেরুয়া প্রার্থী তুলে আনছেন ভোটের বাজারে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top