বুদ্ধদেব দাস, কেশিয়াড়ি, ১৬ সেপ্টেম্বর- কেশিয়াড়ির সর্বমঙ্গলা মন্দিরে দেবী দুর্গা পূজিত হন বিজয়মঙ্গলা রূপে। প্রতি রাতে বিগ্রহের ভোগ হিসাবে থাকে পান্তাভাত ও মাছভাজা। নিয়ম মেনে তাই পুজোর চারদিন দুর্গাকে নিবেদন করা হয় এই প্রসাদ। যুগ যুগ ধরে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের দুর্গাপুজোয় এই নিয়ম চলে আসছে। সেই প্রসাদ খেতে ভিড় করেন বহু মানুষ।
রাজা মানসিংহের আমলের আগে থেকেই কেশিয়াড়িতে রয়েছে দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দির। মূল মন্দিরের মোট তিনটি ভাগ রয়েছে। যার শেষ ভাগে অর্থাৎ বর্তমানে মন্দিরে ঢোকার মুখের অংশটি রাজা মানসিংহের আমলে তৈরি হয়েছে। লোকবিশ্বাস, সর্বমঙ্গলা নাকি অত্যন্ত জাগ্রত দেবী। এই এলাকায় দুর্গাপুজো শুরু হয় সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজো  দিয়ে। প্রাচীন রীতি মেনে আজও দেবী সর্বমঙ্গলাকে প্রতি রাতে মাছ ভাজা–সহ পান্তাভাত ভোগ দেওয়া হয়।
তখন কেশিয়াড়ি ছিল জঙ্গলে ঘেরা। লোকশ্রুতি রয়েছে, পালকিতে চেপে কোনও এক মহিলা একটি কুল গাছের  তলায় বিশ্রাম করেন। তার পর দেখেন বেহারা আর নেই। সেই মহিলাই আসলে দেবী সর্বমঙ্গলা। আরও কথিত আছে যে, রাজা মানসিংহের মনস্কামনা পূর্ণ করেছিলেন এই দেবী। তাই দেবীর নিত্যপূজার জন্য তিনি অনেকটা জমি দিয়ে গিয়েছিলেন। ময়ূরভঞ্জের এক রাজা, সিংভূমের রাজা, খড়্গপুর গ্রামীণ এলাকার খেলাড়ের জমিদার শতপথি পরিবার, বেলদার কুশমুড়ির জমিদার দেব পরিবার সর্বমঙ্গলা মায়ের নামে শুধু জমি নয়, গয়না এবং মন্দিরও দান করেছিলেন। সর্বমঙ্গলা এতটাই সাধারণের দেবী অনেকেই তঁাকে কন্যা স্নেহে ‘‌মঙ্গলাবুড়ি’‌ বলেও সম্বোধন করেন। শুধু কেশিয়াড়ি, বেলদা, খড়্গপুর, নয়াগ্রাম নয়, ওডিশা থেকেও বহু মানুষ আসেন পুজো  দিতে। 
এখানে মানত পূরণে দেবীকে নতুন বস্ত্র পরানোর রীতি আছে। এক–এক সময় এত ঘনঘন বস্ত্র পরানো হয় যে, ঘন ঘন দেবীর রূপ পালটে যায়। তাই এলাকার মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, ‘‌মঙ্গলাবুড়ির ষোলো ঘড়ি ষোলো বেশ’‌। এখানে দুর্গাপুজো শুরু হয় পঞ্চমী থেকে। পঞ্চমীর দিন ঘট উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সর্বমঙ্গলা রূপী ‘‌বিজয়মঙ্গলা’কে দেবী দুর্গারূপে পুজো করা শুরু হয়। ওইদিন পঁাঠাবলি হয়। পুজোর পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রত্যহ চাল কুমড়ো বলি দেওয়া হয়। সন্ধিপুজোয় পঁাঠাবলি হয়। এখন ট্রাস্ট্রি বোর্ড পুজো পরিচালনা করে। মন্দিরের নামে ১৫ বিঘা ধানজমি রয়েছে। মন্দিরের সামনের অংশটি রাজা মানসিংহের আমলে তৈরি হয়। রয়েছে নাট মন্দির।
ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্য পুরোহিত অসিত মিশ্র বলেন, ‘‌দেবী নিরামিষাশী নন বলে অনেকেই মাছের ঝোল–সহ ভোগ দেন। তবে মাছের রান্নায় পেঁয়াজ, রসুন ব্যবহার হয় না। দুর্গাষ্টমী ও বাসন্তী অষ্টমীতে নিরামিষ ভোগ হয়। রাতে দেবীকে ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় পান্তাভাত আর মাছভাজা।’‌ দুর্গাপুজোর সময় সর্বমঙ্গলাকে দেবী দশভুজা রূপে পুজো করা হয়। তবে মহালয়া থেকে চতুর্থী পর্যন্ত মূল মন্দির বন্ধ রাখা হয়। মন্দিরের ভেতরের অংশ এবং দেবীকে নবরূপে সাজিয়ে তোলা হয়। তখন মন্দিরের সামনে সর্বমঙ্গলাকে দুর্গা রূপে বিজয়মঙ্গলাকে পুজো করা হয়। বহু  মানুষ আসেন দুর্গারূপী দেবী সর্বমঙ্গলাকে পুজো দিতে। শুধু দুর্গাপুজো নয়, কালীপুজোর সময় দেবী কালিকা এবং বাসন্তী পুজোর সময় দেবী বাসন্তী রূপে পূজিতা হন। গর্ভগৃহে আজও দেবীর আসন রয়েছে সেই কুলগাছের মূলে।

গোধূলিবেলায়। কাশফুল সংগ্রহে ব্যস্ত দুই কিশোর। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে। ছবি:‌ স্বরূপ মণ্ডল

জনপ্রিয়

Back To Top