চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়,কাটোয়া: স্নান করে গাছপালা প্রাণখোলা বরষায়, / নদীনালা ঘোলাজলে ভরে ওঠে ভরসায়। এই অবস্থায় আনন্দে ময়ূর–নাচ নাচে দানা শেখের তনুমন। কী করবে খুঁজে পায় না বছর ছাব্বিশের দানা। কখনও হি–হি হাসিতে নালার জলে পা ডোবায়। কখনও আনন্দ–অশ্রু ঝরিয়ে ডোবার জলে গা ডোবায়। 
কাটোয়া ১ নং ব্লকের শ্রীখণ্ড মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা দানার এক্কেবারে জল–অন্ত প্রাণ। দিন–রাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খাবার আর প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্মের জন্য ডাঙায় থাকে মেরেকেটে ঘণ্টাচারেক। বাকি সময়টা জলেই কাটায়। আর ভারী বৃষ্টিতে যখন ‘ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদগদ, / গান করে অতিশয় বদখত।’ তখন দানাও আহ্লাদে আটখানা। জলের বুকে কত রকম সঁাতার কাটে। মা ফুলিয়া বিবি খাবারের থালা হাতে পুকুরপাড়ে দঁাড়িয়ে হঁাক পাড়েন, ‘একবার উঠে আয় বাপ। মুখে চাট্টি কিছু দে।’ তার পর আপনমনেই বিড়বিড় করেন, ‘ছেলেটার সব খিদে তেষ্টা কেড়েছে সব্বোনাশী জল।’
দানা যখন দেড় বছরের শিশু, তখন থেকেই জলের প্রতি অমোঘ টান দেখে তাজ্জব হয়ে যেতেন পরিবারের লোকজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশীরা। যেখানেই একটু জল পড়ে থাকবে, সেখানেই গিয়ে বসে পড়ত দানা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলের প্রতি টান তীব্র হতে থাকে। নিজের তাগিদেই সঁাতার শিখে ফেলেছিল দানা। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার পথে জলা দেখলেই সেখানে ঝঁাপিয়ে নতুন শেখা ছড়া আওড়াত দানা, দে–রে ডুব দে–রে ডুব / খেলা আজ হবে খুব / এখানে জলেতে থই পাই না। 
‘দিন মানত না, রাত মানত না, সর্বক্ষণ জলেই থাকত ওইটুকু ছেলেটা। ব্যাপারটা সুবিধের না ঠেকায় প্রথমে ওঝা, পরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। বহু টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু রোগ সারেনি। আমি গরিব মানুষ। জন খেটে খাই। কতদিন আর ডাক্তার দেখাব?‌ দানার ভাগ্য তাই আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি।’ দীর্ঘশ্বাস ঝরে দানার বাবা হতদরিদ্র ইয়াসিন শেখের। দানার কথাবার্তাও কেমন জড়ানো। বহু অনুনয়–বিনয়ে ডাঙায় তুলে দিনরাত জলে থাকার কারণ জানতে চাইলে দানা বলে, ‘শরীরে জ্বালা। জ্বালা জুড়োতে জলে থাকি। আরাম লাগে বেশ।’ কোনও রকমে কথায় ইতি টেনে আবার তরতরিয়ে জলে নেমে যায় দানা। গ্রামের বাসিন্দা নিমাই ঠাকুর, প্রশান্ত পঁাজারা বলছিলেন, ‘রাতবিরেতে দানাকে পুকুরে ডোবা–ওঠা করতে দেখে অনেকে ভয় পেতেন। ভূত–টুত ভাবত। এখন অবশ্য গা–সওয়া হয়ে গিয়েছে। নিশুত রাতে পুকুরের জল নড়লে বা শব্দ হলে সবাই বোঝেন, দানা জলে।’ কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসক জয়ন্ত সিংহ বললেন, ‘শুনে মনে হচ্ছে এটা মানসিক ব্যাধি। টানা চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করালে দানা সুস্থ হয়ে যাবে।’ 
ডাক্তারের কাছেও যেতে চায় না দানা। যাবে কী করে? তখন যে ‘খাল–বিলে ভরা জল, / দীঘি করে টলমল, / নদী যেন ছোটে কূলহারা। জলে ঝঁাপায় ‘জলের কই’ দানা।

জলের মধ্যেই দিন কাটে দানা শেখের। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top