সোহম সেনগুপ্ত, বারাসত: ‘‌ডিজাস্টার পি এম‌!‌’‌
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই দুই শব্দে আবার তাঁর শাণিত ভাষায় আক্রমণ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগরের সভায় সরাসরি মোদির নাম করে দেশে ‘‌বিপর্যয়’‌ ডেকে আনার প্রধান হোতা বলে আক্রমণ করেছিলেন। আর শুক্রবার এখানে আরও সুর চড়িয়ে মমতা বললেন, ‘‌নির্বাচনের আগে একটা ছবি ছেড়ে দিয়েছে। অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার নামে। আমি কংগ্রেস করি না। দল থেকে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু তা–‌ও বলব, যা করা হয়েছে তা তথ্যবিকৃতি। এটা অন্যায়।’‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন আউট্রাম ঘাটে একটি সরকারি অনু্ষ্ঠানেও এই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, ‘‌ওই ছবিতে সোনিয়া ও রাজীবের বদনাম করা হয়েছে। ‌এটা রাজনীতির অধঃপতন। যখন ক্ষমতায় থাকবে না, তখন মোদির নামেও সিনেমা হবে। তাই বলছি, কেউ কখনও ছেড়ে কথা বলবে না। এর পরে তাহলে ডিজাস্টার পি এম‌–‌ও দেখতে হবে। নির্বাচনের আগে নাটক করছেন মোদি।’‌ তাঁর পরামর্শ, ‘‌নিজের চেহারা আয়নায় দেখুন। ভয় পায় মানু্্ষ। হাসতে জানেন না। দেখলেই মনে হয় গব্বর সিং আসছে।’‌
নোটবন্দি থেকে জিএসটি, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির দরবৃদ্ধি, সিবিআই–‌সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ— এরকমই নানা বিষয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নাগাড়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চাইছেন মোদি। এই বক্তব্যের রেশ ধরে এদিনও বারাসত কাছারি মাঠে যাত্রা উৎসবের উদ্বোধন এসে সংরক্ষণ বিল নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে তোপ দাগলেন মমতা। কেন মোদি ‘‌ডিজাস্টার পি এম’ তা তাঁর বক্তৃতাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।‌
অলোক বর্মা প্রসঙ্গে
‘‌কেন্দ্রে ডিক্টেটরশিপ চলছে। সুপার ইমার্জেন্সি চলছে। ইন্দিরা গান্ধীর সময়েও এমন হয়নি। আমাদের দেশে সিবিআই–‌সহ বড় বড় ইনস্টিটিউশন রয়েছে। রাজনীতির রং চড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’‌ অলোক বর্মা বিতর্ক প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কড়াভাবে বলেছেন, ‘‌সিবিআই এবং আরবিআই–‌কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। আমরা সবসময় চেয়ারকে সম্মান করি। এরা লক্ষ্মণরেখা লঙ্ঘন করছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, এসব রাজ্যের বিষয়। অথচ কেন্দ্র প্রতিমুহূর্তে হস্তক্ষেপ করছে।’‌ আয়ুষ্মান ভারতের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। গুজরাট থেকে বিহারিদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অসমে গোলমাল করছে। আমাদের সরকার অসম, ত্রিপুরার মানুষদের পাশে আছে, থাকবে।‌ 
উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ নিয়ে মমতা বলেছেন, ‘‌যাদের বছরে আট লাখ টাকা আয় তাদের জন্য চাকরিতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণ করা হল। এর ফলে শ্রমিক, কৃষক, গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েরা কোনও চাকরি পাবে না। আর চাকরিই নেই তো সংরক্ষণ কীসের?‌ এক বছরে ২ কোটি লোক মোদির আমলে বেকার হয়েছে। আত্মহত্যা করেছে ১২ হাজার কৃষক। কেন্দ্র নোটবন্দির নামে টাকা লুঠছে। রাফাল চুক্তি করছে। সামাজিক সুরক্ষার প্রকল্পগুলি বিজেপি–‌র লোগো দিয়ে নিজেদের নামে প্রচার করছে। এই তো অবস্থা!‌ ‌শুধু বড় বড় কথা বলছে কেন্দ্র। কিন্তু কাজের বেলায় কিছু নেই। রাজ্য সরকারই শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব কিছু দেখছে। আর ওঁরা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বাড়িতে বাড়িতে চিঠি দিয়ে উন্নয়নের বুজরুকি দিচ্ছেন।’‌
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রাজ্যের উন্নয়নের চেহারাটাও তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবেই। কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী–‌সহ বহু উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বাম আমলেরও প্রসঙ্গ টেনেছেন। মমতা বলেন, ‘‌আমাদের সরকার ‌অনেক কাজ করছে জনগণের উপকারে। এই সাড়ে সাত বছরে কতটা এগিয়েছে বাংলা, কী কাজ হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনওদিন কেউ ভাবেনি, ২ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়া যাবে। কন্যাশ্রীর সংখ্যা ৫০ লক্ষ। আমরা এর সিলিং তুলে দিয়েছি। যারা সরকারি স্কুলে পড়বে, তারাই কন্যাশ্রী। ভোট আসছে। আর ভোটবাবুরা ডাকাডাকি শুরু করেছে।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর মতে, কেন্দ্র যেমন তার কাজ করবে তেমনই রাজ্য সরকার তার নিজের কাজ করবে। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থা ভেঙে দিতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। আবাসন, শৌচালয়, স্বাস্থ্য বিমা— সবই নাকি মোদি করছেন। এমনই প্রচার শুরু করেছে ওরা। মমতার প্রশ্ন, ‘‌তাহলে রাজ্যও কি চুপ করে বসে আছে?‌ আমরা কৃষকদের খাজনা মকুব করেছি। শস্যবিমা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে রাজ্য সরকার।’‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘‌কেন্দ্র যে স্বাস্থ্য বিমার চিঠি দিচ্ছে, তার কোনও গুরুত্ব নেই। নির্বাচনের পর ওটা হারিয়ে যাবে। ওই টাকা আমরা প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তার কারণ, রাজ্যের সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসার পরিষেবা দেয়। আমাদের রাজ্যে বিহার, গুজরাট, অসম, বাংলাদেশ কিংবা নেপাল থেকে রোগীরা চিকিৎসা করতে আসেন। কোনও খরচ লাগে না। মোদি সরকার সব ব্যাপারেই ভাঁওতা দিয়ে যাচ্ছে।’‌

 

পুড়ছে মোদির কুশপুতুল। হিন্দ সিনেমার সামনে, শুক্রবার। ছবি: শিখর কর্মকার

জনপ্রিয়

Back To Top