Saraswati Puja: এজেন্সি আনবে ভোগ, টেন্ডার ডেকে সাজসজ্জা! ‘স্বচ্ছতা’ বজায় রাখতে উচ্ছ্বাসে ফাঁকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে?

রিয়া পাত্র: সরস্বতী পুজো আর কদিন পরেই।

প্রস্তুতি তুঙ্গে একেবারে। কিন্তু পুজো ঘিরে সাড়া পড়ে গেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিদ্ধান্তে। নোটিস দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরস্বতী পুজোর একটা বড় অংশ  আউটসোর্স করা হবে। সহজ কথায় বলতে, প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর জন্য টেন্ডার ডাকা হল। সঙ্গে আরও বেশ কিছু ডু’জ অ্যান্ড ডোন্টস। কী বলছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ?
১। কেবল মাত্র বর্তমান ছাত্রছাত্রীরাই পুজোর কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। কোনও প্রাক্তন পড়ুয়া কোনওভাবেই এই পুজোর কাজের অংশ হতে পারবেন না।
২। পুজোর ভোগ-প্রসাদ বিতরণের দায়িত্বে থাকবে কোনও সুপরিচিত কোম্পানি। যাদের আগেও এই ধরণের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
৩। মূর্তি, দশকর্মা, ফুল, ফল  প্রভৃতির দায়িত্ব থাকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের হাতে।
৪। প্যান্ডেল, আলোকসজ্জার জন্য ডাকা হয়েছে টেন্ডার। 
পুজো, ফুল,ফল, দশকর্মা, প্রসাদ ইত্যাদির জন্য শুক্রবার কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
 নোটিস প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গেছে ক্যাম্পাসে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পাঁচ ক্যাম্পাসে আলাদা আলাদা ভাবে না করে, এক হাতে সব দায়িত্ব দিলে কাজ হবে সহজে। পড়ুয়াদের কেউ মনে করছেন, গত কয়েকবছরে ভোট হয়নি। নেই নির্বাচিত ছাত্র সংসদ। তাই হয়ত এই সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিক ভাবেই সিদ্ধান্তের কথা শুনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নবীন-প্রবীণদের মুখে। আর তার অনুষঙ্গেই উঠছে প্রশ্ন, স্বচ্ছতা আর প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে কোথাও ফাঁকি পড়ছে না তো উচ্ছ্বাসে? 
 সরস্বতী পুজো ঘিরে বরাবরই ছাত্রছাত্রীদের অন্যরকম রোমাঞ্চ থাকে। এমন ছেলেমেয়ে কই, যাদের বড় হওয়ায় এই একটা দিন গভীর দাগ কেটে রাখেনি। যারা স্কুলে যায়, যারা স্কুল টপকে কলেজ এবং কলেজ টপকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাদের জন্য এই জানুয়ারি বড্ড ব্যস্ততার। পড়াশোনা, সেমিস্টারের থেকে অনেক বড় দায়িত্ব এখন কাঁধে। লিস্ট বানানো হয়ে গিয়েছে এতদিনে, কে কে যাবে ফুল কিনতে, কে যাবে প্রতিমা আনতে, কে কাটবে ফল, আর কে পরিবেশন করবে খিছুড়ি, বেগুনি। বলে দিয়েছে দাদা-দিদিরা, বেগুনি কিন্তু একটা করেই, চাটনি এক চামচ। শীতের দুপুর গড়িয়ে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে সরস্বতী পুজো নিয়ে প্ল্যান চলছেই। কত মনোমালিন্য হয়ে গেল গত ক’দিনে, পুজোর তোড়জোড়ে কত বন্ধুত্ব হল ক্যাম্পাসের ছাদে। কিন্তু কোথাও গিয়ে কি মনখারাপ কলেজস্ট্রিট, আলিপুর, বালিগঞ্জ, টেকনোলজি ক্যাম্পাস, হাজরা ল কলেজে? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো ক্যাম্পাস, এতগুলো পুজো। অন্য বছর  ব্যস্ততা চরমে থাকে। কিন্তু এবার? পাঁচ ক্যাম্পাসের ভোগ-প্রসাদ-প্যান্ডেল-আলপনা সবকিছুর জন্য একগুচ্ছ নিয়ম। সরস্বতী পুজোতেও নিয়ম? কেউ বলছেন ঠিক আছে, এত দায়িত্ব কে নেবে? কলেজস্ট্রিটের বিতান ঘোষ যেমন বলছেন, 'না খারাপ লাগছে না খুব একটা। ইউনিভার্সিটি স্বচ্ছতার খাতিরে কিছু নিয়ম করেছে। মনে হয় তাতে কোনও অসুবিধে নেই। কারণ পুজো আমরাই করব। একসঙ্গে, হাত মিলিয়ে, বরাবরের মতো।' এবছর ফাইনাল ইয়ার ইংরেজির তুলিকার। তিনি বলছেন, 'এমনিতেও সেমিস্টার, সিলেবাস নিয়ে চাপ থাকে। এবার যদি কেউ থাকে আলাদা করে দায়িত্ব নেওয়ার, অসুবিধে কী? আমাদের তো থাকতে মানা করা হয়নি।' অন্যদিকে আলিপুরের প্রথম বর্ষের শ্রেয়া বলছেন, ' দু’টো বছর আমরা এই আবেগটুকু নিতে চেয়েছিলাম মন থেকে। কিন্তু আবেগের মাঝে এজেন্সি, টেন্ডার এই শব্দগুলো বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। আমাদের আবেগে ঘা লাগছে এই কিছু অফিসিয়াল শব্দে।' বালিগঞ্জের দ্বিতীয় বর্ষের মনোজ, ইউনিভার্সিটির নোটিশ দেখে হতাশ। তাঁর বক্তব্য, 'আমরা যতই থাকি, মন খুলে কাজ করতে পারব না। সরস্বতী পুজোর কাজে নজরদারি কেন থাকবে?'

অনেকের প্রশ্ন, সরস্বতী পুজো কি এসব মেনে, ভেবেচিন্তে হয়? হাল্কা চালে মানুষ বলে থাকে, সরস্বতী পুজো বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে। পুজোর থেকে তার আগের দিনগুলোর উচ্ছ্বাস আর পরের কত মনখারাপের সঙ্গী কলেজস্ট্রিটের বেদি, আলিপুরের ক্যান্টিন। বছর খানেক হল ইউনিভার্সিটি ছেড়েছেন শতরূপা। বলছেন, 'এক সময়ে  আমরা পুজোয় কী হবে আর কী হবে না তার আলোচনায় কফি হাউসের  গিয়ে বসতাম। সেখানে আড্ডা হত সোলার ডিজাইন থেকে মিষ্টি সব নিয়ে। এবার কী হবে, কতটা হবে সেসব পরের কথা। কিন্তু যা একান্তই আমাদের কাজ, সেখানে টেন্ডারের মতো, কোম্পানির মত শব্দ থাকবে? খারাপ লাগে, সব কিছু কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দিলে উত্তেজনার রাতগুলো হারিয়ে যাবে না তো?' সবে সবে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন অরুন্ধতী। 'টেন্ডার শব্দটা শুনে আন্তরিকতা শব্দটায় ধাক্কা লাগল। সরস্বতী পুজো আমার, আমাদের। বন্ধুদের বলতাম আমাদের পুজো। কিন্তু টেন্ডার হলে আমরা শুধু অংশ নেব, ‘আমাদের’ বলার জায়গা থাকবে কি?' প্রশ্ন উঠছে অনেক।

আকর্ষণীয় খবর