অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই এক সিনেমাওয়ালা। প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষের মতো পরিচালকের সঙ্গে। আর, তিনি কতখানি দক্ষ অভিনেতা, তার ছাপ রেখে গেছেন কৌশিক গাঙ্গুলির ‘‌সিনেমাওয়ালা’‌, ‘‌বিসর্জন’‌–‌এর মতো একটার পর একটা ছবিতে। তিনি, অরুণ গুহঠাকুরতা প্রয়াত হলেন মঙ্গলবার দুপুরে, ৭৬ বছর বয়সে। গত বুধবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন দক্ষিণ কলকাতার এক নার্সিংহোমে। তিনদিন আগে তাঁর করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁকে ভর্তি করা হয় বাঙুর হাসপাতালে। এখানেই মঙ্গলবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রেখে গেলেন স্ত্রী, মেয়ে, জামাই–‌সহ তাঁর স্বজন, বান্ধব, অনুরাগীদের। আজ, বুধবার তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। মেয়ে পায়েল জানালেন, অরুণবাবুর স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এদিনই। 
১৯৪৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশে তাঁর জন্ম। পরের অসমে থেকেছেন। তারপর কলকাতায়। এখন থাকতেন নাকতলায়। অল্প বয়স থেকেই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত। সিনেমা তৈরির সমস্ত টেকনিক্যাল কাজ শিখেছিলেন নিপুণভাবে। সেই ‘‌থিম অন্নপূর্ণা’‌ থেকে ‘‌আনোয়ার কা আজব কিস্যা’‌ পর্যন্ত পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলেন তিনি। শোকাহত বুদ্ধদেববাবু বললেন, ৪০ বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। শুধু তো আমার প্রধান সহকারী পরিচালকই ছিল না, আমার পরিবারেরই একজন ছিল। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। টেকনিক্যালি এতটাই সমৃদ্ধ ছিল অরুণ যে, এখনকার যে কোনও পরিচালককে কাজ শেখাতে পারত। বুদ্ধদেববাবু বললেন, সোমবার সকালেও মোবাইল ফোনে কথা বলেছি অরুণের সঙ্গে। হাসপাতাল থেকেই বলল, ভাল আছি। আজ চলে গেল। 
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতোই শোকাহত পরিচালক গৌতম ঘোষ। বললেন, আমার সঙ্গে চল্লিশ বছরের বন্ধুত্ব। আমার পাঁচটা ছবিতে প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে আছে ‘‌যাত্রা’‌, ‘‌কালবেলা’‌, ‘‌মনের মানুষ’‌, ‘‌শূন্য অঙ্ক’‌ আর ‘‌রাওনীর’‌। গৌতমবাবু বললেন, অসমের লেখক ভবেন শইকিয়ার ছবিতে অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন অরুণবাবু। সেই ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। 
দক্ষ অভিনেতা হিসেবে তাঁকে বাংলার দর্শক পেয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলির ‘‌সিনেমাওয়ালা’‌, ‘‌বিসর্জন’‌, ‘‌বিজয়া’‌–সহ অনেক ছবিতে। কৌশিক বললেন, ‌এতটাই সূক্ষ্ম ও গভীর অভিনেতা অরুণদা যে, তাঁকে ভেবেই আমি পার্ট লিখতাম। কৌশিকের শুটিং হয়ে যাওয়া নতুন তিনটি ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন অরুণ গুহঠাকুরতা। সেই তিনটি ছবির মুক্তি তাঁর দেখা হল না। ‘‌সিনেমাওয়ালা’‌য় হল মালিক ‘‌প্রণববাবু’‌ তথা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগী ছিলেন ‘‌হরি’‌ অরুণ গুহঠাকুরতা। ‘‌হরি’‌র চলে যাওয়ার খবরে শোকাহত পরান বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ষাটের দশক থেকে আমাদের পরিচয়। একসঙ্গে অভিনয় করতাম থিয়েটারে, ‘‌প্রাচীতীর্থ’‌ নাট্যগোষ্ঠীতে। বড় মানুষ, বড় অভিনেতা। কৌশিকের ছবি দেখেই মানুষ অভিনেতা অরুণ গুহঠাকুরতাকে চিনল। সে ছিল সত্যিই এক সিনেমাওয়ালা। 
অনেক নতুন পরিচালকের ছবিকে অকাতরে সাহায্য করেছেন তিনি। তৈরি করেছিলেন টেলিফিল্ম ‘‌সমান্তরাল’‌। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত জানালেন, রবি ঘোষ ছিলেন প্রধান ভূমিকায়। সেই ছবি অসমাপ্ত থেকে গেছে। 
অভিনেতা হিসেবে কৌশিক গাঙ্গুলির পরবর্তী ছবিতেও তাঁর অভিনয় করার কথা ছিল। অসমাপ্ত থেকে গেল সেই কথাও। অরুণ গুহঠাকুরতার মৃত্যুতে বাংলা সিনেমাজগৎ কিছুটা দরিদ্র হয়ে গেল। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top