উৎপল চ্যাটার্জি: অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ঈশান পোড়েলকে নিয়ে মাতামাতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলে বাংলার একমাত্র মুখকে নিয়ে মাতামাতি হবে না তো কাকে নিয়ে হবে? বাংলার একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার হিসেবে ওর এই সাফল্যে আমিও গর্বিত। ঈশান অনেক কম বয়স থেকেই আমার আকাদেমিতে ক্রিকেট খেলেছে, এটা ঠিক। আবার আমি যখন বাংলা অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ, সে–সময়ও ঈশান সেই দলে ছিল। তা বলে ওর এই সাফল্যে আমি কোনওরকম কৃতিত্ব দাবি করতে চাই না। এই সাফল্য ওর পরিশ্রমের ফল।
আকাদেমির শিক্ষার্থী ক্রিকেটারদের ভিড়ে কাউকে আলাদা করে মনে রাখা যায় না। অনূর্ধ্ব ১৬ বাংলা দলে থাকার সময়েও ও খুব বেশি ম্যাচ খেলেনি। তবে ঈশানকে আলাদা করে মনে থাকার একটাই কারণ, ওর উচ্চতা। শুরু থেকেই দেখেছি বয়সের তুলনায় ও একটু বেশিই লম্বা। এমনিতেই জোরে বোলাররা একটু চোটপ্রবণ হয়, তার ওপর ঈশানের অতিরিক্ত উচ্চতার কারণে সেই সম্ভাবনা আরও বেশি। এ বিষয়ে এবার ওকে আরও সতর্ক হতে হবে। স্ট্রেংথ বাড়ানোর জন্য ট্রেনিংয়ের ওপর আরও জোর দিতে হবে। কারণ এবার ওরা প্রত্যেকে ক্রিকেট সমুদ্রে এসে পড়ল। যেখানে এগিয়ে যেতে হলে, প্রতিদিন ধাপে ধাপে উন্নতি করে যেতে হবে। সেটা না পারলেই মুশকিল। অবশ্য রাহুল দ্রাবিড়ের পাঠশালায় নিশ্চয়ই সেই শিক্ষা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে।
কীভাবে নিজেকে চোট–আঘাত থেকে বাঁচিেয় রাখতে হয়, এবার সেটা ঈশানের নিজেকেই বুঝতে হবে। এখন তো ক্রিকেট আরও আধুনিক হয়েছে। ক্রিকেটারদের সুরক্ষিত রাখতে কত সরঞ্জাম। ঈশানের সেগুলো ব্যবহার করা উচিত। আমাদের সময় পেস বোলার চোট–সমস্যায় ভুগলে গোড়ালিতে ক্রেপ লাগিয়ে বল করত। এখন তো আ্যাঙ্কলেট, নি–গার্ডের মতো জিনিস চলে এসেছে। ম্যাচে তো অবশ্যই, ঈশানের উচিত প্র্যাকটিসের সময়েও সেগুলো ব্যবহার করা। নিজেকে চোট থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের প্রত্যেক ক্রিকেটারের কাছেই বিশ্বকাপ ছিল নিজেদের তুলে ধরার মঞ্চ। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গোড়ালির চোটটাই ঈশানকে কিছুটা হলেও পিছিয়ে দিয়েছিল। গ্রুপ লিগের ম্যাচগুলো হাতছাড়া হওয়া বড় ক্ষতি। হয়তো আইপিএলে দল না পাওয়াটাও সেটার একটা বড় কারণ। বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে বড় মঞ্চ। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, এখানে ওর সমসাময়িকরা লড়াই করেছে। আইপিএল কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সাজঘরে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়। যেখানে ঈশানের মতো তরুণদের উন্নতি করার একটা বড় সুযোগ থাকে। নাগারকোটি, মাভিরা সেই সুযোগটা এবার পেয়ে যাবে।
আগেই বললাম, ঈশানরা এবার ক্রিকেট সমুদ্রে এসে পড়ল। কলকাতা ময়দানে খুঁজলে অনূর্ধ্ব ১৯ ভারতীয় দলে খেলা অনেক ক্রিকেটার পাওয়া যাবে। নিেজকে উন্নত করতে না পারলে ঈশানকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তবে ওর কাছে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক রাহুল দ্রাবিড়কে কাছ থেকে পাওয়া। দ্রাবিড়ের ক্রিকেটদর্শন বা ক্রিকেটসাধনা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। একবার ভারতীয় দলের ক্যাম্পে দ্রাবিড় আমার রুম পার্টনার ছিল। একদিন রাতে দেখি, ঘুম েথকে উঠে টয়লেট থেকে ফেরার সময় নিজের ব্যাটটা নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুটো স্যাডো করে এসে আবার শুয়ে পড়ল। কথা বলে বুঝেছিলাম, সকালে নেটে ব্যাটিংয়ে একটা ভুল তখনও ওর মাথায় ঘুরছে। এমন ক্রিকেটসাধককে গুরু হিসেবে পাওয়াটা বড় প্রাপ্তি। আশা করি, দ্রাবিড় এই বাচ্চাগুলোর মধ্যে নিজের ক্রিকেটদর্শন ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে। ঈশানরা সেটা কতটা, কীভাবে নিতে পেরেছে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top