সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে। এখন দেশে ফেরার কথা ভাবতেই পারেন না। সেই যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় তাঁকে। তবু রোজ মাঠে নেমে রক্ত–ঘাম ঝরান। সামনে আই লিগ জেতার হাতছানি, ইস্টবেঙ্গলের মিডফিল্ড জেনারেল মাহমুদ আল আমনার মুখোমুখি মুনাল চট্টোপাধ্যায়

আইজলকে আই লিগে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের শুরু থেকেই আপনার কাছে বাড়তি প্রত্যাশা। আপনার কি মনে হয়েছিল লাল–হলুদ জার্সি গায়ে চাপানো ঝুঁকির?‌ চ্যাম্পিয়ন না হলে কিন্তু অনেক কটু কথা শুনতে হবে। 
আমনা:‌ আমি এর আগে স্পোর্টিং ক্লাব দ্য গোয়ার হয়ে খেলেছি। তখন সিরিয়ার জাতীয় দল বা চ্যাম্পিয়ন ক্লাব আল ইত্তেহাদের খেলার সুবাদে আমার কম নাম ছিল না। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেই অতীত সাফল্য কোনও দাম পায়নি। আইজলে চ্যাম্পিয়ন না হলে সম্ভবত একইরকম হত। আই লিগ জেতায় ইস্টবেঙ্গলে খেলার ডাক পেলাম। ভালভাবেই জানতাম, স্পোর্টিং, আইজল আর ইস্টবেঙ্গল এক নয়। কলকাতায় খেলার চাপ প্রচণ্ড। মিডিয়া, ফ্যান, অফিসিয়াল কেউ ছেড়ে কথা বলবে না। তবে এটা ভেবে পিছিয়ে যাইনি। আমার জীবনটাই লড়াইয়ে ভরা। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসি। সেই মনোভাব নিয়ে আই লিগের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত লড়ে যাব। 
 আইজলের থেকেও তো ইস্টবেঙ্গলের দল কাগজে–কলমে শক্তিশালী। চ্যাম্পিয়ন কোচ খালিদ জামিল–সহ ওই দলের একাধিক ফুটবলার এবার লাল–হলুদে। তাও কেন আই লিগ জেতাটা এতটা কঠিন হয়ে পড়েছে ইস্টবেঙ্গলের কাছে?‌
আমনা:‌ এখানে প্রচণ্ড চাপ। আইজলে এই চাপটা কারও ওপর ছিল না। এখানে তো মাঠের ভেতর ও বাইরে সর্বত্র পাহাড়প্রমাণ চাপ। ফুটবলাররা  স্বাভাবিক খেলাটাই তুলে ধরতে পারছে না। পান থেকে চুন খসলে একদল রে রে করে উঠছে। এটাতে আরও খারাপ হচ্ছে। সমর্থকদের যন্ত্রণা বুঝি। কিন্তু তাদেরও এটা মাথায় রাখতে হবে, একটা ম্যাচ হারলেই সব কিছু শেষ নয়। এক পারসেন্ট চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা যতক্ষণ থাকছে, সব বিরোধিতা ভুলে সাপোর্ট করুন। 
 আপনারা যদি শেষপর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হন, তা হলে দুটো ডার্বি হারের কোনও দুঃখ নিশ্চয়ই থাকবে না?‌
আমনা:‌ ডার্বি সবসময় স্পেশাল। এ নিয়ে সারা বিশ্বে আলাদা উন্মাদনা। কিন্তু ডার্বি জয়ই শেষ কথা নয়। ডার্বি জিতলাম, অথচ ট্রফি পেলাম না, এটা আমার কাছে অর্থহীন। ডার্বি না জেতার দুঃখ সবসময় থাকবে, কিন্তু এটাও মাথায় রেখেছি, ডার্বি জেতা বা হারা মানে ৩ পয়েন্ট আসবে বা যাবে। তার বেশি কিছু নয়। বাকি ম্যাচগুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ডার্বির কথা ভাবুন। ওটা ছিল আমাদের আই লিগের দ্বিতীয় ম্যাচ। হারতেই এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল শিবিরে, মনে হয়েছিল সেদিনই চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ছিটকে গিয়েছি। অথচ তখনও ১৬ ম্যাচ বাকি ছিল। আমরাও যদি সেই চাপটা নিতে না পেরে লড়াইটা ছেড়ে দিতাম, তা হলে ১৪ বছর পর আজ আর খেতাব জয়ের সম্ভাবনাটুকু প্রবল ভাবে ফিরে আসত না। ডার্বির পর আমরা জিততে শুরু করি। মোহনবাগানে ঘটে উল্টোটা। এটাই ফুটবল। 
 দৌড়ে ফিরে আসার টার্নিং পয়েন্ট কোনটা?‌ 
আমনা:‌ মিনার্ভা আর নেরোকা দুটো দলই আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। তখন আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল যত সম্ভব বেশি  ম্যাচ জেতা। সূচিতে অনেক প্রতিকূলতা ছিল। গায়ে গায়ে ম্যাচ। পঞ্চকুলার ঠান্ডা থেকে দুপুর ২টোয় গিয়ে কেরলের মাটিতে খেলা। মিনার্ভা বা অন্য দল সূচিতে যে সুবিধে পেয়েছে, আমরা তা পাইনি। তবু লড়াই ছাড়িনি। দুটো মিনার্ভা ম্যাচের একটাতে ড্র, একটা ওদের মাটিতে গিয়ে জেতা। এই না হারাটাই টার্নিং পয়েন্ট। আর একটা ম্যাচের কথা বলতে হবে। বারাসতে ইনজুরি টাইমে ডুডুর গোলে ইন্ডিয়ান অ্যারোজ ম্যাচে জয়। 
 সোমবার লাজংয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ। পাহাড়ে ইস্টবেঙ্গলের রেকর্ড তেমন ভাল নয়। এটা কি চিন্তায় রাখছে?‌ 
আমনা:‌ লাজং ম্যাচ নিঃসন্দেহে কঠিন হবে। ওদের কিছু হারানোর নেই, আমাদের আছে। এখানেই গতবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে। শিলঙের মাঠে লাজংয়ের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে শুরুতে এক গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষপর্যন্ত ১-‌১ করে খেতাব জিতেছিলাম। এবার সেখানে ৩ পয়েন্ট পাওয়া ছাড়া কিছু ভাবছি না। চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে ৭-‌১ গোলে জয়টা এখন অতীত। বাকি দুটো ম্যাচই ফাইনাল। এবার বেশ কিছু ম্যাচে পয়েন্ট গেছে মনঃসংযোগ নষ্টের জন্য। আমাদের খেলা খারাপ হচ্ছে, এমন মোটেই নয়। এই শেষ দুম্যাচে প্রথম থেকে রেফারির শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কোনওরকম মনঃসংযোগ হারালে চলবে না। চূড়ান্ত পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে ট্রফি জিততে। এমন সুযোগ বারবার আসবে না। 
 এডু কার্ডের জন্য এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। ডিফেন্স নিয়ে তো বড় চিন্তা থাকছে। 
আমনা:‌ এডু গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। থাকলে খুব ভাল হত। কিন্তু নেই বলে, হা–হুতাশ করলে তো চলবে না। অর্ণব, গুরবিন্দার, সালামরা আছে। তারা যথেষ্ট যোগ্য। তা ছাড়া আমি, কাৎসুমি, ডুডু ও অন্যরা বাড়তি দায়িত্ব নিতে তৈরি।
 আপনার দেশ সিরিয়া গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। আপনি ও আপনার পরিবার দীর্ঘদিন দেশছাড়া। ট্রফি জিতলে সেটা কি সিরিয়ার মানুষদের উৎসর্গ করবেন?‌ 
আমনা:‌ (‌বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখে)‌ এ সব নিয়ে কথা বলতে কষ্ট পাই। ১৪ বছরের খরা কাটিয়ে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ট্রফি দিতে পারলে খুশি হব। সেই সাফল্যের অংশীদার থাকবে ক্লাবের সঙ্গে জড়িত সকলে। আমি যখন ভাল কিছু করি, তখন সারা বিশ্বের মানুষ জানতে পারে আমার দেশের নাম, কারণ আমি সিরিয়ার ফুটবলার। ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হলে একজন সিরিয়াবাসী হিসেবে তাতে আমার ভূমিকা আছে জেনে দেশবাসীর ভাল লাগবে। সেটাই হবে ওদের বড় উপহার।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top