সৌমিত্র কুমার রায়: ‌বলিউডের ‘‌উড়তা পাঞ্জাব’‌ ছবিটা এক লহমায় মনে আসতে বাধ্য। ধীরে ধীরে একটা রাজ্য, বিশেষত সেখানকার তরুণ প্রজন্ম কীভাবে ডুবে যাচ্ছে ড্রাগের অতলে, তার বাস্তব চিত্রটা দেখানো হয়েছিল সেই সিনেমায়। একটা গোটা রাজ্য যেন বেঁচে থাকার জন্য বেছে নিয়েছিল ড্রাগ।
কাট করে আসা যাক ৮ মার্চ, ২০১৮–তে। পাঞ্জাবের, বিশেষত পাঞ্জাবি ফুটবলের ইতিহাসে সম্ভবত স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে দিনটা। ভারতের উত্তর–পশ্চিমের এই রাজ্য একসময় ছিল ফুটবলের পথিকৃৎ। কী সব প্লেয়ার উপহার দিয়েছে তারা!‌ ১৯৬২ এশিয়াডে সোনাজয়ী জার্নেল সিং তো বটেই, একসময় দাপিয়ে খেলেছেন ইন্দার সিং, হরজিন্দার সিং, সুখবিন্দার সিং, জিএস পারমাররা। ১৯৯৬–তে যখন প্রথমবার জাতীয় লিগ শুরু হয়, তখন পাঞ্জাবেরই জেসিটি তা জিতেছিল, সুখবিন্দারের কোচিংয়ে। এরপর বেশ কিছু বছর খেললেও, আসতে আসতে ভারতীয় ফুটবল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল পাঞ্জাব। ফুটবলার উঠে আসছিলেন, কিন্তু খেলছিলেন অন্য রাজ্যের হয়ে। অবশেষে সে অপেক্ষার অবসান। বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের ইতিহাসে ফুটবলে নতুন সূর্যোদয় হল।
গত বছর আমরা আইজলের উত্থান দেখেছিলাম। কীভাবে আগের মরশুমে অবনমনে নেমে যাওয়া একটা ক্লাব ইতিহাস ঘটাতে পারে, আইজল যেন ভারতের লিস্টার সিটি হয়ে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিল। মিনার্ভার কৃতিত্বও তো তার থেকে কম নয়। গত বছরই তো আই লিগ অভিষেকে নবম স্থানে শেষ করেছিল তারা। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই মিনার্ভাই ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানকে টপকে চ্যাম্পিয়ন। এর পেছনে রহস্যটা কী?‌
কারণ খুঁজতে বসলে প্রথমেই যেটা উঠে আসছে তা হল, গ্রাসরুট ফুটবলের ওপরে জোর দেওয়া। ২০০৫–এ নিজেদের ক্রিকেট এবং ফুটবল আকাদেমি তৈরি করে মিনার্ভা। সেখান থেকেই নিয়মিত সিনিয়র দলের সাপ্লাই লাইন হয়ে উঠেছে তারা। ২০১৫–এ আই লিগে দ্বিতীয় ডিভিশন দিয়ে খেলা শুরু। খোগেন সিংয়ের যে দল এদিন চ্যাম্পিয়ন হল, তার বেশিরভাগই স্থানীয় ছেলে। সঙ্গে আছেন চেঞ্চো গেলসেন, উইলিয়াম ওপোকুর মতো বিদেশিরা।
এই সাফল্যের পিছনে একটা মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ না করলে খুব ভুল হবে। তিনি হলেন মিনার্ভার কর্ণধার রঞ্জিত বাজাজ। আদ্যন্ত ফুটবলপাগল একজন মানুষ। মালিক হয়েও, দলের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ— সবই করেছেন। টিমটাও তৈরি করেছেন রীতিমতো বুদ্ধি খাটিয়ে। অকারণে বড় নামের ওপরে ঝোঁকেননি। নজরে রেখেছেন প্রতিভাবান অথচ অনামী বিদেশিদের। যে–কারণেই চেঞ্চো, ওপোকুরা সুযোগ পেয়েছেন দলে। শুনলে অবাক হতে হয়, মোহনবাগানে সনি নর্ডির যা বাজেট ছিল অথবা ইস্টবেঙ্গলের আমনা–ডুডু মিলিয়ে যা বাজেট ছিল, সেই সমপরিমাণ বাজেটের টিম হল মিনার্ভা। অহেতুক বিদেশিদের পিছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালার রাস্তায় হাঁটেননি রঞ্জিত।
চলতি বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিক পারফরমেন্স দেখাচ্ছিল মিনার্ভা। এক সময় কলকাতার দুই প্রধানের থেকে পয়েন্টের নিরিখে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর আই লিগের সাপ–লুডোর খেলায় অনভিজ্ঞ থাকায় শেষ কয়েক রাউন্ডে এসে হতাশাজনক ফল করে। তারপরে দলের দুই প্লেয়ারকে ম্যাচ গড়াপেটার প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও মানসিকতায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় সে–সব কাটিয়ে উঠেছে তারা। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ধরেই নিয়েছিলেন মিনার্ভা চ্যাম্পিয়ন হবে। তাই অঘটনের প্রশ্নই নেই। না জিতলে বোধহয় সেটাই সবথেকে বড় অঘটন হত।‌‌

ভারতসেরা মিনার্ভা। মালিক রঞ্জিত বাজাজকে নিয়ে বাজিদের উল্লাস।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top