সুব্রত মুখার্জি: খুব মনে পড়ছে তাঁর কথা। বারবার। কারণ, তাঁর হাত ধরেই আমার বিশ্বকাপের হাতেখড়ি। হ্যাঁ, আমি প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির কথাই উল্লেখ করতে চাইছি। রাত জেগে রাশিয়া বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গিয়ে মনে পড়ছে প্রিয়দার কথা। বেশ কয়েকবার প্রিয়দার সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে গেছি। ’৯০ বিশ্বকাপ, জাপান–দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপ। শুধু মনে হচ্ছে প্রিয়দা যদি সুস্থ থাকতেন, বেঁচে থাকতেন, তাহলে এবারও নিশ্চয়ই হইহই করে বিশ্বকাপ দেখতে যেতেন। আমি নিশ্চিত আমাকেও নিয়ে যেতেন। সত্যি, একেক সময় খেলা দেখতে দেখতে প্রিয়দার কথা খুব মনে পড়ছে। মনখারাপও লাগছে। অদ্ভুত ব্যাপার, এবারের বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে আরও একটা বিষয় মনে হচ্ছে বারবার। বিশ্ব ফুটবলের অধিকাংশ ফুটবলার বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলার সময় নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন না। অথচ ক্লাব ফুটবলে নিজেদের শতকরা একশো ভাগ উজাড় করে দেওয়ার জন্য তৈরি থাকেন তাঁরা! কারণ, দেশের হয়ে খেলায় টাকা তো নেই বেশি। উল্টোদিকে ক্লাব ফুটবল তো টাকার খনি। লক্ষ্য করার বিষয়, পেলে অথবা মারাদোনার সময়ে এই ব্যাপারটা কিন্তু ছিল না। পেলের শেষের দিকে খেলার বিভিন্ন রেকর্ডিংয়ে দেখেছি। লক্ষ্য করেছি নিজেকে দেশের হয়ে খেলার সময় কীভাবে নিংড়ে দিতেন। পরের দিকে মারাদোনা তো বটেই। ক্লাবের হয়ে মারাদোনা যেমন খেলতেন তেমনি েদশের হয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য তৈরি থাকতেন। আর এখনকার ফুটবলাররা শুধু ক্লাবের হয়েই খেলে থাকেন। দেশের জন্য নয়। আমি বরাবরই ইউরো ফুটবলের ফ্যান। জার্মানির সমর্থক। শুরু থেকেই। অলআউট ফুটবল খেলে ওরা। এবার রাশিয়াতে জার্মানি প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছে। মনখারাপ। খেলা দেখার চার্ম খুঁজে পাচ্ছি না। তবুও বিশ্বকাপ দেখছি। আসলে বড় খেলার আসর মিস করতে ইচ্ছে করে না। এবারও বড় বড় ফুটবলারের খেলা দেখছি। মন ভরাতে পারছে না। মেসির বিদায়ে বিশ্বকাপের ক্ষতি হল। উন্মাদনায় ভাটা পড়ল। তা–‌ও বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা তো খেলা দেখছেনই। এখনকার ফুটবলে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল, সব ফুটবলরারই সব পজিশনে খেলছেন। মারাদোনা, পে‍লের সময়ে সেটা ছিল না। একেক সময় একটু ডিফেন্সিভ খেলা হচ্ছে। উইং প্লে দেখতে পাচ্ছি না। এমনকি মাঝমাঠ থেকে ডিফেন্স চেরা থ্রু দেখছি না। কোনও তুলনায় না গিয়ে বলছি যেমন কলকাতা মাঠে হাবিব, সমরেশরা থ্রু বাড়াতেন তেমন। মারাদোনা যেভাবে লং পাস থ্রু দিতেন, সেটাও দেখতে পাচ্ছি না। খারাপ ফুটবলের জন্য কোচেরাই দায়ী হয়ে থাকেন। কারণ, কোচই বস। প্রচুর টাকা বেতন হিসেবে নেন। মেসির পর রোনাল্ডোও মন ভরাতে পারল না। প্রথম দিকের কয়েকটি ম্যাচ ছাড়া। কলকাতা যদিও এখনও বেঁচে আছে বিশ্বকাপে। ব্রাজিলের জন্য। নেইমাররা টিকে আছে বলেই উন্মাদনা আছে। ছোট ছোট দেশ ভাল খেলছে। লড়াই করছে বড় দেশগুলোর বিরুদ্ধে। এদের থেকেই পরবর্তী প্রজন্মে মারাদোনা, পেলে হতে পারে। এখনও পর্যন্ত কোনও ফুটবলারই কিন্তু ওদের ধারেকাছে নেই। একক ক্ষমতায় দেশকে ফাইনালে তোলা মারাদোনা ছাড়া কেউ পারেননি। পেলের পাশে টোস্টাও, গ্যারিঞ্চার মতো তারকারা ছিলেন। মারাদোনার পাশে সেই অর্থে কেউ ছিলেন না। বুরুচাগা, আর পরের দিকে ক্যানিজিয়া ছাড়া। মারাদোনা যা করেছেন, একাই করেছেন। এসব নিয়েই তো বিশ্বকাপের খেলা দেখতে দেখতে আলোচনা হত প্রিয়দার বাড়িতে। প্রিয়দা খেলাটা বুঝতেন। মাঠে খুব চুপচাপ খেলা দেখতেন। প্রিয়দার ইচ্ছে ছিল ভারতে যদি বিশ্বকাপের আয়োজন করা যায়?‌ তাহলে আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতও বিশ্বকােপ অংশ নিতে পারত। যা–‌ই হোক রাতে খেলা দেখতে অবশ্য ভালই লাগছে। সারাদিনের কাজের পর বেশ রিল্যাক্সড হয়ে যাচ্ছি বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে দেখতে

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top