সার্ভিসে সেই ঝাঁঝ নেই, ভলিও খুব দুর্বল। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা না করে আপন ছন্দে এগিয়ে গিয়েছেন সোফিয়া কেনিন। কী সেই ছন্দ?‌ লিখলেন অনির্বাণ মজুমদার।

ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় ছিলেন ক্রিস এভার্ট। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের তৃতীয় রাউন্ডে যখন কোকো গাউফ ৬–‌৩, ৬–‌৪ গেমে নাওমি ওসাকাকে হারিয়ে দিলেন, তখন এভার্টের গলায় শোনা গেল, ‘‌কোকোর আবির্ভাব ঘটে গেল। মেয়েদের টেনিসকে চাঙ্গা করতে ঠিক এটাই দরকার ছিল আমাদের। টেনিস প্রস্তুত তার নতুন রানিকে বরণ করে নিতে।’‌ 
সোফিয়া কেনিন প্রস্তুত ছিলেন না। চতুর্থ রাউন্ডে গাউফকে হারালেন তিন সেটে। তার মধ্যে শেষ সেটটা জিতলেন একটাও গেম না হারিয়ে। অথচ তার আগে ২১ বছরের কেনিনকে নিয়ে আলোচনা হলেই শোনা যেত, এর সার্ভিসে সেই ঝাঁঝ নেই, ভলিটা অনেক ঘষা–‌মাজা করতে হবে। ‌কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা না করেই এবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন এই মার্কিন খেলোয়াড়। উল্টে তাঁর বক্তব্য, ‘‌যাঁরা খেলেন বা আমাদের সার্কিটের একটু–‌আধটু খবর রাখেন, তাঁরা সবাই জানেন, আমি হাল ছেড়ে দিই না। যদি আমাকে হারাতে হয়, সত্যিই হারাতে হবে। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। স্কোরলাইন মাথায় রাখি না। শুধু লড়ে যাই। ম্যাচের মোড় ঘোরানোর জন্য নিজের সেরাটা দিয়ে যাই। সেটা বেশ কয়েকবার করে দেখিয়েওছি।’‌
এই করে দেখানোর টাটকা নিদর্শন মেলবোর্ন পার্কের সেমিফাইনাল। বিশ্বের এক নম্বর অ্যাশলে বার্টির বিরুদ্ধে দুটি সেটেই দুটি করে সেট পয়েন্ট বাঁচিয়ে কেনিন জেতেন ৭–‌৬ (‌৮–‌৬)‌, ৭–‌৫ গেমে। প্রাক্তন মার্কিন ট্রেসি অস্টিন বলছেন, ‘‌ও (‌কেনিন)‌ হাল ছাড়ে না। ওর একটা অদ্ভুত ফোকাস আছে। অসম্ভব খিদে আছে। অনেক বড় বড় প্লেয়ারকে জানি, যারা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের চাপটা একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু কেনিন এটা ভালবাসে।’‌
সোফিয়া কেনিনের টেনিসের প্রতি ভালবাসা সেই ছয় বছর বয়স থেকে। তাই ওই বয়সের একটা মেয়ের মুখে শোনা যায়, যদি কোনওদিন অ্যান্ডি রডিকের বিরুদ্ধে খেলতে হয়, তাকে কী করে সামলাবে, তার টোটকা। গাট্টাগোট্টা মেয়ের সেই ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এভার্ট বলছেন, ‘‌এতদিন ওর মূল্যায়ন হয়নি। সেরেনা উইলিয়ামস, ম্যাডিসন কিস, স্লোন স্টিফেন্স, কোকো গাউফদের মতো পাওয়ার প্লেয়ারদের কাছে ও চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আমেরিকা ওকে চেনে। জানে ওর ভেতরে কী আছে। বুঝে গেছে ও চ্যাম্পিয়ন।’‌
সেরেনাকে টপকে কেনিন এখন মহিলাদের সার্কিটে এক নম্বর মার্কিন। কোকো গাউফ, নাওমি ওসাকা, অ্যাশলে বার্টি, বিয়াঙ্কা আন্দ্রেস্কু, সিমোনা হালেপদের বৃত্তে ঢুকে পড়েছেন তিনি। এঁদের সবার কাছে কেনিন এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ।
তাঁর নিজের চ্যালেঞ্জটা অবশ্য কম কঠিন ছিল না। জন্মের তিন মাস পরেই রুশ বাবা–‌মা আলেকজান্ডার ও লেনা তাঁকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসেন। বাবার পকেটে তখন মাত্র ৩০০ ডলার। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির কেনিনকে তাই অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ট্রফিতে চুমু খেয়ে বলতে শোনা গেল, ‘‌ছোটবেলাতেই বাবা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাদের জন্য সময়টা খুব কঠিন হতে যাচ্ছে। প্রায় সহায়–‌সম্বলহীন অবস্থায় ওদের আমেরিকায় চলে আসতে হয়েছিল। ওদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ওরা না থাকলে এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না। অনেকেই আমার ওপর তখন আস্থা রাখতে পারেননি। বলেই দিয়েছিলেন, আমার যা চেহারা, আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু সেই পাঁচ বছর বয়সেই আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এই দিনটার। সেদিনই জানতাম, স্বপ্ন যখন একবার দেখেই ফেলেছি, তখন সেটা পূরণ করেই্‌ ছাড়ব।’‌
স্বপ্নপূরণ হয়েছে ধাপে ধাপে। আমেরিকার ১২ থেকে ১৮ বছরের প্রতিযোগিতায় সবকটি বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ১৪ বছর বয়সে আইটিএফ সার্কিটে জেতেন প্রথম পেশাদার ম্যাচ। ২০১৫ সালে ১৬ বছর বয়সে হয় গ্র‌্যান্ড স্লামে অভিষেক। ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রি পান ইউএস ওপেনে। পরের বছরও ইউএস ওপেনে খেলার সুযোগ পান। ২০১৮ সালে মহিলাদের র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথম পঞ্চাশে চলে আসেন। সেই বছর হারান তৎকালীন ছয় নম্বর ক্যারলিন গার্সিয়া ও নয় নম্বর জুলিয়া জর্জেসকে। 
গত বছর জেতেন প্রথম ডব্লুটিএ খেতাব। ২০১৯ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের তৃতীয় রাউন্ডে তৎকালীন এক নম্বর সিমোনা হালেপকে প্রায় হারিয়েই দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত হালেপ জেতেন ৬–‌৩, ৬–‌৭ (‌৫–‌৭)‌, ৬–‌৪ গেমে। না–‌পারাটুকু কেনিন পুষিয়ে দেন ফ্রেঞ্চ ওপেনে। হারিয়ে দেন সেরেনা উইলিয়ামসকে। জিতে নেন বিশ্ব টেনিসের নিয়ামক সংস্থার বিচারে সবথেকে উন্নতি করা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
এই বছর প্রথম গ্র‌্যান্ড স্লাম জয়। অস্ট্রেলিয়া জয় করার পর কেনিনের স্বপ্ন দেখা থেমে যাচ্ছে না। লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছেন— ইওরোপ জয়। মেলবোর্নের মাটি থেকেই তাঁর ঘোষণা, ‘‌টেনিস ঐতিহ্যের শেষ কথা উইম্বলডন। নামলেই কীরকম একটা অনুভূতি হয়। আমার বারবার ওখানে ফিরে যেতে ভাল লাগে। ওই দর্শকদের সামনে খেলতে দারুণ লাগে।’‌
একটা স্বপ্ন পূরণ করে ফেলেছেন। আরেকটা যখন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন, তখন সোফিয়া কেনিনের ওপর আস্থা রাখা যায়।‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top