সুনীল গাভাসকার: টেস্ট এবং একদিনের সিরিজ থেকেই বোঝা যাচ্ছে ভারত আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে তফাত কতখানি। এটা ঘটনা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের সেরা প্লেয়ারদের পায়নি। তারা বিভিন্ন দেশের টি২০ লিগে খেলছে। কিন্তু তা হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কয়েকজন ক্রিকেটারের যা প্রয়োগ ক্ষমতা দেখলাম, সেটা সত্যিই বোধগম্য হল না। একই ভুল বারবার করে যাচ্ছে। ওদের শেখার কোনও ইচ্ছেই নেই। ওদের দেখে মনে হচ্ছে, কোনও অনুশোচনাও নেই। তারপর ওদের কোচ স্টুয়ার্ট ল–‌কে যা বলতে শুনলাম, তাতে কয়েকজন ক্রিকেটারের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।
এখন প্রায় সব দেশই তাদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি করছে। ফলে প্লেয়াররা যেরকমই খেলুক না কেন, ক্রিকেটারদের মাইনে নিশ্চিত। হয়তো সেই কারণে ওদের কয়েকজনকে দেখে মনে হল, নিজেদের পারফরমেন্স নিয়ে চিন্তিত নয়।
ভারতের একমাত্র চিন্তার কারণ নিরাপত্তা। রাজকোটে প্রথম টেস্টের পর হায়দরাবাদে পরের ম্যাচেও ঠিক একই জিনিস দেখলাম। প্রায় সব জায়গাতেই দেখছি টসের আগে প্রচুর লোক মাঠে ঢুকছে। আর এই সংখ্যাটাই বহু গুণ বেড়ে যাচ্ছে ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সময়। এটা শুধু ভারতেই দেখা যায়। বড় কোনও ঘটনা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি। এর কারণ ভারতীয় দল জিতছে। উল্টোটা হলে কী হত, বলা মুশকিল। এটা বন্ধ করতেই হবে। প্লেয়ারদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও ভাবেই আপস করা যাবে না। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় তো এরকম দেখা যায় না?‌ সেখানে আয়োজক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এবং সেক্রেটারি ছাড়া আর কাউকে মাঠের ভেতর দেখা যায় না। আর এখানে পুরো ম্যানেজিং কমিটি, সঙ্গে তাদের পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক এবং আরও অনেকে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্লেয়ারদের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে। হয়তো এদের সবারই মাঠে প্রবেশাধিকার রয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তারক্ষীদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়। যতক্ষণ না এই ব্যাপারটায় রাশ টানা হচ্ছে, ততক্ষণ ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা থেকেই যাবে।
যখন প্রথম টেলিভিশন ধারাভাষ্য দিতে শুরু করেছিলাম, তখন কিংবদন্তি রিচি বেনোর কাছে কিছু পরামর্শ চেয়েছিলাম। উনি সবার আগে আমাকে যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা হল, দরকার না পড়লে, মাঠের ভেতরে যেন না ঢুকি। উনি বলেছিলেন, ঘাস অত্যন্ত মূল্যবান। এটার ওপর শুধু প্লেয়ার, আম্পায়ার আর মাঠকর্মীদের অধিকার আছে। তাই মাঠ থেকে দূরে থাকা উচিত। আমি এখনও সেটাই মেনে চলি। শুধু পিচ রিপোর্ট করতে হলে, বা টিভি শো থাকলে তবেই মাঠে ঢুকি। আমার অনেক সহকর্মীই আছেন, কোনও কাজ না থাকলেও প্লেয়ার, আম্পায়ার, সাপোর্ট স্টাফদের সঙ্গে আড্ডা মারার জন্য সুযোগ পেলেই মাঠে ঢুকে পড়েন। কেউ কেউ তো স্রেফ মুখ দেখাবে বলেও মাঠে ঢোকেন।
রাজকোটে একজন তো পুলিসের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সোজা বিরাট কোহলির কাছে গিয়ে সেলফিও তুলে ফেললেন। তারপর কোহলিকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেন, গালে চুমুও খেতে চেয়েছিলেন। ঠিক তখনই পুলিস গিয়ে তাঁকে বার করে দিয়েছিল। কেউ কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে ঢুকলে সেদিন কিছু একটা ঘটে যেত। পরের দিনের সংবাদপত্রগুলোও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে তেমন কিছু লিখল না। বরং যে মাঠে ঢুকেছিলেন, তিনিই বেশি প্রচার পেয়ে গেলেন। তিনি এখন তাঁর বন্ধুমহলে রীতিমতো নায়ক।
এই প্রচার দেখে হায়দরাবাদে পরের ম্যাচে আরেকজন মাঠে ঢুকে পড়ল। পরের দিনের স্থানীয় সংবাদপত্রে তার শুধু ছবিই বেরোয়নি, দেখলাম তার জীবনীও বেরিয়েছে। 
এখানে পুলিস ঘুমিয়ে থাকে কেন?‌ এর কারণ গ্যালারির দিকে মুখ করে থাকার বদলে তারা মাঠের দিকে মুখ করে থাকে, খেলা দেখে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় কিন্তু পুলিস গ্যালারির দিকেই মুখ করে থাকে। এতে শুধু কারা মাঠে ঢোকার চেষ্টা করছে, সেটার দিকেই খেয়াল রাখা যায়, তা নয়। কেউ কিছু ছোঁড়ার চেষ্টা করছে কিনা, সেটাও দেখা যায়। এদের সঙ্গে ওয়াকিটকি থাকে। সঙ্গে সঙ্গে খবর দিয়ে দেয়। ফলে সমস্যা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সমাধান করে ফেলা যায়। অথচ ভারতে কিন্তু বিদেশের থেকে বেশি পুলিস মাঠে থাকে। অথচ, কিছু হলে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায় এখানকার পুলিস। পুরস্কার বিতরণের পর্ব মিটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিস মাঠ ছেড়ে চলে যায়। ভাবে বোধহয় কাজ শেষ হয়ে গেছে। মাঠ থেকে সব দর্শক না বেরনো পর্যন্ত পুলিসের থাকা উচিত। যদি বোঝা যায় যে, নিরাপত্তারক্ষীরা নেই, তা হলে দর্শক কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার পরেও মাঠে ঢুকে পড়বে। এমনকী ড্রেসিংরুমেও ঢুকে পড়তে পারে। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। 
কিন্তু তারপরেও পুলিসের মাঠ ছাড়া উচিত নয়। স্টেডিয়াম থেকে দর্শকরা যখন বেরোয়, তখন সবাই রাস্তায় নেমে আসে। ফলে টিম বাসও নড়তে পারে না। একবারের জন্যও বলা হচ্ছে না, পুলিসের কাজটা সহজ। কিন্তু এত বছর পরেও কেউ পুলিসকে শেখাল না মাঠের দর্শকদের কীভাবে সামলাতে হয়।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top