দেবাশিস দত্ত, নটিংহ্যাম: বাঁ–হাতে চোট পাওয়ার কারণে শিখর ধাওয়ানকে দলের বাইরে ছিটকে যেতে হচ্ছে না। ভারতীয় দল মঙ্গলবার রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আহত শিখরকে দলের সঙ্গে এখানেই রেখে দেওয়া হবে। দলের সঙ্গে যে মেডিক্যাল টিম রয়েছে তাদের পর্যবেক্ষনেই তিনি আপাতত থাকবেন। পরিবর্ত হিসেবে ভারত থেকে অন্য কোনও ক্রিকেটারকে উড়িয়ে আনাও হচ্ছে না। আপাতত দাঁড়ি। অথচ এদিন সকাল থেকে শিখরের চোটকে কেন্দ্র করে যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তাতে তাঁকে ফেরৎ পাঠানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসার কারণে তাঁকে লিডসের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হয়তো এক্ষুণি সুস্থ হবেন না। কিন্তু দেশে ফেরৎ পাঠিয়ে দেওয়া হলে, পরে যদি সুস্থও হয়ে ওঠেন তখন তাঁকে দলে ফিরিয়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিও থাকত না। তখন হয়তো আইসিসির অনুমতিও পাওয়া যেত না। একারণেই পরিবর্ত হিসেবে কাউকে নেওয়া হল না। দল অপেক্ষায় থাকছে। কত দ্রুত সু্স্থ হয়ে উঠতে পারেন শিখর তার জন্য।
এটাই কি নিয়তি?‌ তা না হলে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় যিনি চ্যাম্পিয়নের মতো ব্যাটিং করেন, সেই শিখর ধাওয়ানকে, দ্বিতীয় ম্যাচে ১০৯ বলে ১১৭ রান করে ছিটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়!‌ অপ্রত্যাশিত বললেও কম বলা হয়। কেউ ভাবেননি, বুড়ো আঙুল চোট পাওয়ার কারণে শিখরকে চলে যেতে হতে পারত। শিখর ধাওয়ান অন্তত নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে খেলতে পারবেন না। এটা তো বজ্রাঘাতের মতোই। এ পর্যন্ত আইসিসি আয়োজিত সব প্রতিযোগিতা মিলে যে ২০টি ম্যাচ তিনি খেলেছেন, রান করেছেন ১২৩৮। গড় ৬৫.‌১৫। শুধুমাত্র ওভালেই করেছেন ৪৪৩ রান। এমন একজন ক্রিকেটারকে হঠাৎ করে খেলাতে না পারার কারণে ভারতীয় দলে ঝটকা তো লাগলই। বড় ঝটকা। (‌চোট কোন হাতের বুড়ো আঙুলে, এটা জানাতাম না সকাল পর্যন্ত। রাতে জানা গেল, বাঁ–হাতের পিছনের দিকে চোট পেয়েছিলেন। যে চোট বুড়ো আঙুল এবং তার ঠিক পাশের আঙুলের মাঝখানে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে, কুল্টার–‌নাইলের ছোবল তঁার আঙুলে পড়ায় ওভালে ফিল্ডিং করতে পারেননি। সেটা যে ভেঙে গেছে এবং তিনি খেলতে পারবেন না, এটা ঘুণাক্ষরেও কেউ বুঝতে পারেননি।)‌
এবার আলো ফেলা যাক, মঙ্গলবার সকালের ঘটনার পরম্পরায়:‌ স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ৮টা নাগাদ একটা এসএমএস এসেছিল।শিখর ধাওয়ান নাকি ৩ সপ্তাহের জন্য ছিটকে যাচ্ছেন?‌.‌.‌.‌ বুড়ো আঙুলটা ভেঙে গেছে। ট্রেন্ট ব্রিজ মাঠে যাওয়ার জন্য তখন প্রস্তুত হচ্ছিলাম। বাইরে চলছিল অবিরাম বৃষ্টিধারা। জানালার কাচের ফঁাক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল শুধু সাদা বরফের গুড়ো যেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাচ্ছে প্রবল হাওয়ায়। কিন্তু বেরোতে তো হবেই। কথা ছিল, নিউজিল্যান্ড সকালে প্র‌্যাকটিস করবে। দুপুরে ভারত। স্নানটান ছেড়ে বেরোবার মুহূর্তে ভারতীয় শিবির থেকে জানানো হল, প্রত্যাশিত ঘটনা। টিম ইন্ডিয়া প্র‌্যাকটিসে আসবে না। তা হলে কি নিউজিল্যান্ডও হোটেলেই থাকবে?‌ চলছিল ক্রিকেট লিখিয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। নিউজিল্যান্ড মাঠে আসবে কিনা। অধিকাংশের রায় ছিল, না আসার পক্ষে। ট্রেন্ট ব্রিজে পৌঁছে জানতে পারা গেল, ইনডোর স্টেডিয়াম দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন উইলিয়ামসনরা। এরপর থেকে আমরা শুধু ভেসে গেলাম প্রচার এবং অপপ্রচারের ঢেউয়ে। ভারতীয় শিবির থেকে শিখর ধাওয়ান সম্পর্কে কোনও উচ্চবাচ্য সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত করা হয়নি। অথচ টেলিভিশনের লোকজনেরা নিজেদের মনের মতো করে চিত্রনাট্য তৈরি করে অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন। ব্রেকিং নিউজে জানানো হল— ঋষভ পন্থকে রাতের বিমানে লন্ডন উড়িয়ে আনা হচ্ছে। শিখর ধাওয়ান কতটা অসুস্থ, কবে খেলতে পারবেন— এ ব্যাপারে চলছিল সেই প্রচার এবং অপপ্রচার। প্রথমে বলা হল ৩ সপ্তাহ। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছিল হিসেব, তা হলে তো সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল খেলতে পারবেন!‌ (‌যেন ভারত সেমিফাইনালে উঠেই গেছে!‌)‌
বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং টেলিভিশন চ্যানেলে এই প্রচার চলতে থাকায় ৯০ শতাংশ মানুষ ধরেই নিয়েছিলেন, শিখর ছিটকে গেছেন। কিন্তু একটা সিলমোহর চাই তো বোর্ডের কাছ থেকে। দেশের ক্রিকেট মহল যখন শিখরের চোটকে ঘিরে উত্তাল, উদ্বিগ্ন, তখনও তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিল। শেষে নির্বাচক সমিতির চেয়ারম্যান এমএসকে প্রসাদকে পাওয়া গেল টেলিফোনে। সকাল থেকে অন্তত ৫০ জন ক্রিকেট–‌লিখিয়ে ১০ বার করে চেষ্টা করেছিলেন তঁাকে ধরতে। তিনি আছেন দলের সঙ্গে একই হোটেলে। ফোন না ধরার কোনও কারণ না জানিয়েই কোনওরকমে উত্তর দিলেন, ‘এখনও শিখরের কয়েকটা পরীক্ষা বাকি। তাই এখনই বলা সম্ভব নয় ও ছিটকে যাবে কিনা বা ওর জায়গায় কাকে নেওয়া হবে।’‌
অর্থাৎ তখনও ভারতীয় দল ভাঙা আঙুল নিয়েই শিখরকে খেলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু জনতার আগ্রহ ততক্ষণে পৌঁছে গেছে তুঙ্গে— শিখরের জায়গায় আসছেন কে?‌ ঋষভ পন্থ?‌ কারণ, তিনি বিশ্বকাপের দলে স্ট্যান্ডবাই তালিকায় একনম্বরে। আইসিসি–‌র তরফে রাজশেখর রাও জানালেন, ‘ওই লিস্টের কোনও মূল্য আমাদের কাছে নেই। ১৫ জনের দল ঘোষণার পর কোন দেশ কীভাবে নিজেদের স্ট্যান্ডবাই তালিকা তৈরি করেছে, এটা আমাদের জানার কথা নয়। এটা বিসিসিআইয়ের ব্যাপার।’‌ একই সঙ্গে জানালেন, ‌স্থানীয় সময় সন্ধে ৭টা পর্যন্ত ভারতীয় বোর্ড পরিবর্ত ক্রিকেটার হিসেবে কাউকে অনুমতি দেওয়ার আবেদন করেনি। অনুমতি চাইলে দেওয়া হবে। কারণ, শিখরের চোট লেগেছিল খেলা চলাকালীন, যা সবাই দেখেছে।
তখন কেউ বলছেন, অজিঙ্ক রাহানেকে ডেকে নেওয়া হচ্ছে। কারণ, হ্যামশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন অজিঙ্ক এবং মাসখানেকের বেশি সময় ধরে এদেশে থাকায় পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্থ। 
পরের গুজব, শ্রেয়াস আইয়ার। দিল্লি ক্যাপিটালসের অধিনায়ককে ঢোকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন উত্তরাঞ্চলের নির্বাচক শরণদীপ সিং। জায়গা হয়নি। এখন নাকি এই সুযোগে আবার শ্রেয়াস আইয়ারকে উড়িয়ে আনার জন্য নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
তো, এভাবেই চলল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অজস্র নাম ভেসে এল হাওয়ায়। সমাধানের রাস্তাটা তো নিজেরাই করে ফেলল সফররত প্রচারমাধ্যম। কে এল রাহুলকে দিয়ে ওপেন করিয়ে মিডল অর্ডারে পরিবর্ত ক্রিকেটারকে জায়গা করে দাও। সেক্ষেত্রে পরিবর্ত ক্রিকেটার ছাড়াও বিজয় শঙ্কর, দীনেশ কার্তিকদের সামনে প্রথম এগারোয় ঢোকার দরজা খুলে যেতে পারে। 
ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই আলোচনা বা অপপ্রচার নিয়ে পরিবেশটা অবশ্য উত্তপ্ত হয়ে থাকল আগাগোড়া। (স্থানীয় সময় বিকেল চারটে পর্যন্ত বোর্ড থেকে শিখরের চোটকে কেন্দ্র করে একটি শব্দও খরচ করার সময় হয়নি। এমনকী দলের সঙ্গে যে মিডিয়া বিভাগ ঘুরছে, তারাও মুখে কুলুপ এঁটেছে। এটাই অবশ্য বিসিসিআইয়ের ট্র‌্যাডিশন। চোট লুকিয়ে খেলা বা চোটের খবর জানানোর ব্যাপারে যে অনীহা দেখিয়ে আসছে ভারতীয় বোর্ড বছরের পর বছর, তা এখানেও অব্যাহত থাকল। পরে অবশ্যই জানাবে মেডিক্যাল বুলেটিনে। তখনও কিন্তু এই অভিযোগটা আমরা করেই যাব। চোট লেগেছে শিখরের, ডাক্তার দেখছেন, এটা জানাতে কীসের আপত্তি, ২০১৯ সালে এসেও এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর বিস্ময়জনকভাবে দিতে চায় না বোর্ড।)‌
পুনশ্চ:‌ শিখর যদি খেলতে না পারেন, তা হলে কি কিউয়ি–শিবির খুশি হবে?‌ হওয়ারই কথা। কিন্তু লকি ফার্গুসন বলে গেলেন, ‘আমরা চাইব, শিখর যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরে। আমাদের শিবিরের স্ট্র‌্যাটেজি এরকম— প্রথম দু–‌তিনজন ব্যাটসম্যানকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিতে হবে। শিখর না থাকলেও আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে পাল্টে ফেলছি না।’‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top