দেবাশিস দত্ত: পরিষ্কার উচ্চারণ করলেন, ‘‌ক্যান ইউ টেক মি টু রাসবিহারী অ্যাভিনিউ?‌’‌ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ শব্দ দুটো উচ্চারণ করলেন বঙ্গজ স্বরে। একটু অবাক হলাম। বাংলা বোঝেন, অল্পস্বল্প বলেন। তা বলে কলকাতার একটি রাস্তার নাম এমন চমৎকারভাবে উচ্চারণ করবেন?‌ তাকালেন চোখের দিকে। বোঝাতে চাইলেন, খঁাটি বাঙালি উচ্চারণে চমকে গেলাম কিনা!‌ উত্তর দেওয়ার আগেই সাদা অ্যাম্বাসাডরের বঁাদিকের পেছনের সিটে বসা সুনীল গাভাসকার বললেন, ‘‌আরে, ওখানে আমার মামাতো ভাই সুভাষ মন্ত্রী থাকে। অনেকদিন যাইনি। আমায় নিয়ে চলো।’‌
যথা আজ্ঞে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলার বঁাদিকের ফ্ল্যাটে বেল দিতেই যে মানুষটি বেরিয়ে এলেন, তঁার ছবি আমি দেখেছিলাম কোথাও। ভাবছিলাম, হঠাৎ সুভাষ বলে উঠলেন, ‘‌এঁর কথা আমি প্রচুর শুনেছি শিবাজি দাশগুপ্তর কাছে। আপনাদের এডিটর অশোক দাশগুপ্তর কথাও শুনেছি শিবাজির মুখে।’‌ ছবিটা পরিষ্কার হতে লাগল এক মিনিটেরও কম সময়। আমিও তো শুনেছি সুভাষ মন্ত্রীর কথা শিবাজিদার মুখেই। এরপর আলাপ জমতে বিশেষ সময় লাগেনি। ওই সময়টুকু সুনীল গাভাসকার ছিলেন শ্রোতার ভূমিকায়। যখন আমরা একে অপরকে চিনে ফেলার ব্যাপারে সিলমোহর দিয়ে ফেললাম, তখন গাভাসকার বলে উঠলেন, ‘‌যশদেব সিংয়ের কাছে প্রচুর শুনেছি শিবাজির কথা। হি ইজ আ ফ্যাবুলাস কমেন্টেটর।’‌
মঙ্গলবার সন্ধেয় ময়দানে শ্যামবাজার ক্লাবের ১০০ বছর উপলক্ষে যে প্রীতি ম্যাচ চলছিল ইডেনে, সেখান থেকে ফেরার পথে খবর পেলাম, শিবাজি দাশগুপ্ত আর নেই। ৭১ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। এই সময়ই ফোন পেলাম বন্ধু সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যর কাছ থেকে, ‘‌শ্মশানে কখন নিয়ে যাওয়া হবে?‌‌ কোন শ্মশানে যাওয়া হবে?‌’‌ গৌতম জানত, শিবাজিদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পারিবারিক, বহুদিনের। মুম্বইয়ে অভিজাত পেডার রোডের হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়ামের বিশাল ফ্ল্যাটে শিবাজিদার লেগ ব্রেক বলে ব্যাট করেছি বহুদিন। সামনে থাকত ওঁর শ্যালক ভোমলা। আর স্ত্রী বুলা অতিষ্ঠ হয়ে যেত আমাদের ব্যাট–‌বলের দাপাদাপিতে। কন্যা পমু তখন ছোট। এখন বিয়েশাদি করে বেঙ্গালুরুতে। বউদি কোথায় জানি না। তবে শুনলাম, মৃত্যুর খবর পেয়েও আসেননি।
এমন মন খারাপের পরিমাণ আরও বেড়ে গেল যে, শিবাজিদা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন ২৬ ফেব্রুয়ারি। অথচ এই দুর্দান্ত কমিউনিকেশনের যুগে আমরা তা জানলাম ৯ দিন পর!‌ ভাবতে পারেন!‌ বাইপাসের ধারে টেগোর পার্কের ফ্ল্যাটে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন আর আমরা জানতেও পারলাম না। যখন জানলাম, তখন তিনি ছাই হয়ে গিয়েছেন। এ আমরা কোন পথে চলেছি!‌ লেনিনের মূর্তি ভাঙার বদলা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির গালে কালি লাগানোর জমানায় আছি আমরা। তাই ভারতবর্ষের সর্বকালের অন্যতম এক সেরা ভাষ্যকারের মৃত্যুর খবর পেতে লাগল ৯ দিন। সত্যিই আমরা কেউ কারওর খবর যে রাখি না, তার একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল এই মর্মান্তিক খবর। আকাশবাণী, দূরদর্শনের হয়ে যিনি বড় বড় ম্যাচের ধারাভাষ্য দিয়েছেন, তঁার মৃত্যুর খবর পেতে এত দেরি হল?‌ গৌতমের ফোন পেয়ে, মৃতদেহের গন্তব্যস্থল জানতে গিয়ে ওই ৯ দিন পর মৃত্যুর খবর জানতে পেরে নিজেদের খুব ছোট লাগছে। রাতেই অশোক দাশগুপ্তকে টেলিফোনে খবর জানাতেই তিনি বললেন, ‘‌সত্যিই এখন আমরা কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়ছি। একটা ছবি জোগাড় করতে পারা যায় কিনা দেখ।‌’ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান গৌতম রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল শিবাজিদার। তঁাকে ফোন করে কোনওরকমে যে ছবিটা পেলাম, তা খুব ভাল মানের নয়। তাও ছাপতে হল। ১০ মার্চ, কলকাতা ক্রীড়া সাংবাদিক ক্লাবে স্মরণসভা‌য় আসবেন আর এক শিবাজি দাশগুপ্ত–‌ঘনিষ্ঠ অরুণ ঘোষ। বিএনআর তঁাবুতে অফিসের কাজের শেষে যে দুজনের সঙ্গে একদা আড্ডা দিতেন, সেই অরুণ ঘোষ এবং তুলসীদাস বলরাম খুব ভালবাসতেন। জানি না, বলরামদা এই দুঃসংবাদ পেয়েছেন কিনা। বুধবার সকালে টেলিফোনে বলরামদাকে এ খবর দেওয়ার চেষ্টা করেও পারিনি। কী দিন–‌কাল পড়ল, কৃতী মানুষদের, কাছের মানুষদের খবর রাখার প্রয়োজনীয়তাও আমরা উপলব্ধি করি না। খুব দুর্ভাগ্যজনক।
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আসা যঁাকে দেখে, সেই অশোক দাশগুপ্তর চেম্বারে প্রায়শই একদা দেখা যেত এই দীর্ঘদেহী সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে। স্যুট পরা সাহেব। ঝর্নার জলের মতো ইংরেজি বেরোত মুখ থেকে। শুদ্ধ ইংরেজি। সঙ্গে গতি। খেলা বুঝতেন, তাই শ্রোতার সামনে তুলে ধরতে পারতেন গোটা মাঠটাকে। শুধুই পড়াশোনা করতে গিয়ে অনেকেই বড় ক্রীড়াবিদ হতে পারেননি। কিন্তু, খেলাধুলোর প্রতি দুর্দান্ত ভালবাসা থাকার কারণে, তঁাদের ক্রীড়াপ্রেম প্রতিফলিত হয় অন্যভাবে। শিবাজিদার ক্ষেত্রে তঁার এই ভালবাসা ছিটকে বেরোত মাইক্রোফোনের মাধ্যমে। আজকাল এবং খেলা–‌র পুরনো ফাইলে শিবাজিদা অবশ্য বেঁচে থাকবেন চিরকাল। না বলে চলে গেলেন অভিমানে?‌ হয়তো। ৬ মাস আগে যখন আমাদের মুর অ্যাভিনিউর বাড়িতে উঠে এসেছিলেন সিঁড়ি বেয়ে, তখনও কিন্তু বোঝা যায়নি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। শ্মশানে হাজির থাকতে পারলে একটা মাইক্রোফোন ও একটা পেন নিয়েই যেতাম।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top