আজকালের প্রতিবেদন: সময় বদলায়। পরিস্থিতি বদলায়। কিন্তু অভ্যেস?‌ সব সময় বদলে যায় না। বলা ভাল, কেউ কেউ বদলাতেও চান না নিজেকে। ঠিক যেমন শার্দূল ঠাকুর। দক্ষিণ আফ্রিকায় টি২০ ক্রিকেটে অভিষেকের পর, দিন কয়েক আগেই এমিরেটসের বিমানে ভারতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই চলে যান আন্ধেরি রেল স্টেশনে। লোকাল ট্রেনে চড়ে গন্তব্য পালঘর। এতদিন যা করতেন, সেই রুটিনেই ফিরেছেন শার্দূল। তাঁর এ নিয়ে কোনও কিন্তু কিন্তু ব্যাপার না থাকলেও, রেলযাত্রীরা অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন!‌ এ কী সত্যিই শার্দূল?‌ প্রশ্নটা স্পষ্ট ছিল চোখের ভাষায়।
কিন্তু শার্দূলের অস্বস্তি হয়নি। কেন?‌ শার্দূল বলেন, ‘‌জানেন, আমি যখন লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করতাম, লোকে জিজ্ঞেস করত, এতক্ষণ ট্রেন চড়ে যাতায়াত করে কখন মুম্বইয়ের হয়ে আর কখন ভারতের হয়ে খেলবে?‌ কেউ কেউ তো খোঁচা দিয়ে এমনও বলত, ‘‌এতদূর থেকে এসে কে আবার ক্রিকেট খেলে?‌ টাইম পাস বন্ধ কর।’‌ কিন্তু আমি জানতাম, কী করছি। নিজের জীবনটা ক্রিকেটেই উৎসর্গ করব, ঠিক করে ফেলেছিলাম তখনই। সেই তাঁরাই এবার যখন বাড়ি ফিরছিলাম ট্রেনে, তাকিয়েছিল অবাক চোখে!‌ কেউ কেউ তো সেল্‌ফি তোলার আবদারও করল!‌ কয়েকজন তো সরাসরি জানতেও চাইল, ‘‌একজন ভারতীয় ক্রিকেটার লোকাল ট্রেনে চড়ে বাড়ি যাচ্ছে?’‌‌ ওদের প্রশ্ন শুনে, পুরনো দিনগুলো মনে পড়ছিল। তবে আমি এরকমই থাকতে চাই। পা মাটিতে রেখেই হাঁটতে চাই।’‌ কোনও কিছুই কি সহজে পাওয়া যায় না?‌ শার্দূল বলেন, ‘‌না, একেবারেই না। অনূর্ধ্ব ১৯ হোক বা তার পরের পর্যায়ের ক্রিকেটে। আমাকে সব সময়ই অসম্ভব পরিশ্রম করে নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে হয়েছে। প্রথমে আমাকে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে নেওয়া হয়নি। ফলে আরও বেশি পরিশ্রম করেছি। বলতে পারেন, এই ধাক্কাটা শাপে বর হয়েছিল। ধাক্কাটা আমাকে পরিণত করেছে। বুঝেছি, ব্যর্থতা জীবনে আসবেই। সেটা পেরিয়ে এগোতে হয়। এই ভাবনাটাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’‌
সব পর্যায়ে সবাইকে ভুল প্রমাণ করাই কি আপনার প্রথম লক্ষ্য থাকে?‌ শার্দূলের কথায়, ‘‌আরে এ তো মোটা!‌’‌ লোকে আমাকে দেখলেই শুরুতে এরকম বলত। পরিশ্রম করে নিজেকে এমন করে তৈরি করলাম, যাতে আমার ফিটনেস নিয়ে কেউ আঙুল তুলতে না পারে। এর পর লোকে বলল, ‘‌লাল বলে ঠিকঠাক খেললেও, সাদা বলে খেলতে পারে না।’‌ মুম্বইয়ে খুব বেশি সাদা বলে ক্রিকেট খেলার সুযোগ হয় না। বিজয় হাজারে আর মুস্তাক আলিতে বড় জোর চারটে করে ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকে সাদা বলে। নিজের পারফরমেন্স উন্নত করার জন্য যা মোটেই যথেষ্ট নয়।

আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। প্র‌্যাকটিস করে গেছি সাদা বলে। তাই যখনই কেউ আমাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে, আমি প্র‌্যাকটিসের সময় বাড়িয়ে দিই। আরও বেশি করে পরিশ্রম করি।’‌ 
একসময় নাকি কারও কথা শুনতেন না। এখন?‌ শার্দূল বলেন, ‘‌হ্যাঁ, এটা সত্যি। একসময় বড্ড একগুঁয়ে ছিলাম। কানেই তুলতাম না কারও কথা। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচের সঙ্গেও তর্ক করেছি। কিন্তু কয়েকটা ঘটনার পর বুঝলাম, লোকের পরামর্শ শুনতে হয়। আমিই ঠিক, সব সময় এটা হয় না। কিছু মানুষ আছেন যাঁরা আমার ভাল চান। তাঁদের কথা শোনা দরকার।’‌ কার পরামর্শ সবচেয়ে বেশি শোনেন?‌ শার্দূল জানান, ‘‌দীনেশ ল্যাড। আমার স্কুল কোচ। যখনই ব্যর্থ হই, স্যার বলেন সাফল্য পাওয়ার এটাই প্রথম ধাপ!‌ উনি আমাকে ফোকাস থাকতে বলেন। নিজের ভুলটা খুঁজে বের করতে যা ভীষণ ভাবেই সাহায্য করে। দিনের শেষে নিজের খেলা নিয়ে ভাবতে বলেছেন স্যার। ব্যাটসম্যান কী ভাবছে, সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের খেলায় মন দেওয়াটা সবার আগে দরকার। কীভাবে ভাল ব্যাটসম্যানকে আউট করব, উইকেটে পেছনে খোঁচা দিতে বাধ্য করাব, স্যার সেগুলোও শেখান। ভুল হলে, স্যার ততক্ষণাৎ বলেন। আহা, বেচারা, এই মনোভাব কখনও দেখান না। অভিষেক নায়ারের সঙ্গেও ক্রিকেট নিয়ে প্রচুর কথা বলি। ও আমাকে বারবার বলে, কেন অন্য কিছু নিয়ে ভেবে নিজের প্রতি অবিচার করছ?‌ খেলায় শুধু মন দাও। আরেক জনের কাছেও কৃতজ্ঞ। ওয়াসিম জাফর। পিচের বিভিন্ন জায়গায় বল ফেলে কীভাবে উইকেট তুলে নিতে হয়, ওয়াসিম ভাই শিখিয়েছে।’
নিজের শক্তি কোনটা?‌ ‘‌নতুন বলে সুইং করতে পারি। ১৪০ কিমির বেশি গতিতে বল করা আমার লক্ষ্য নয়। ১৩৭-‌১৩৮ কিমি গতিতে করতে পারলেই যথেষ্ট। নিজের লাইন, লেংথ ঠিক রাখায় শুধু মন দিই। টোয়েন্টি ২০ ক্রিকেটের ধরনটা আলাদা। যেখানে মাত্র ২ বলে খেলার মোড় ঘুরে যায়। তাই সেখানে ইগো সরিয়ে, ক্রমাগত পরিবর্তনে অভ্যস্ত হতে হয়। ভারতীয় দলে ভুবনেশ্বর কুমারের কাছ থেকে আমি যেমন এখন লেক–কাটার শেখার চেষ্টা করছি’, শার্দূল জানান।‌ দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনও সেট ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন?‌ শার্দূল বলেন, ‘আমলাকে ফিরিয়ে। ‌ষষ্ঠ একদিনের ম্যাচে। ও প্রথমে এক ওভারে আমার পাঁচ বলে রান পায়নি। তারপর শেষ বলটায় চার মারল!‌ ওই সময় মিড–অফে ছিল বিরাট। প্রশ্ন করল, আমি কি বাউন্সার দেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী?‌ এ–‌ও বলল, আমলা কিন্তু বাউন্সারে আউট হয়েছে আগে। আমি দিলাম। প্রথমবার ও এক রান নিল। তার পরের ওভারে আবার বাউন্সার দিতে খোঁচা দিল!‌ ব্যস, বল গিয়ে জমা পড়ল উইকেটকিপারের হাতে। ওকে ফিরিয়ে সত্যিই ভাল লেগেছিল।’‌ ‌‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top