আপনি দুটো অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত থাকলেন। ২০১৬ এবং ২০১৮। আপনার দল চ্যাম্পিয়ন হল। কোচ হিসেবে এটা আপনাকে কতটা তৃপ্তি দিচ্ছে?‌
দ্রাবিড়:‌ পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। ২০১৬ সালে প্রতিযোগিতা শুরুর দু–‌তিন মাস আগে আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম। ফলে গুছিয়ে নেওয়ার সময় ছিল না হাতে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ১৫–‌১৬ জনকে শুধু দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা ফাইনালে উঠি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে একটুর জন্য হেরে যাই। এবার ব্যাপারটা অন্য ছিল। এবার আমি ঠিকই করে রেখেছিলাম, একটা নির্দিষ্ট প্রস্তুতি, পরিকল্পনা করব। সেটা যে টুর্নামেন্ট জিতব, তার জন্য নয়। হ্যাঁ, আমরা যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, সেটা অবশ্যই ভাল। কিন্তু সেটা আমাদের মাথায় ছিল না। আমরা সেটা নিয়ে ভাবিনি। বরং আমরা ভেবেছিলাম, ১৫–‌১৬ জনকে শুধু নয়, কী করে আরও বেশি প্লেয়ারকে সুযোগ করে দেওয়া যায়। সবাইকে বিশ্বকাপে সুযোগ করে দেওয়া যায়নি। কিন্তু যারা সুযোগ পায়নি, তারাও দেশের হয়ে খেলার যোগ্য। আমরা ৩০–‌৩৫ জনকে বেছেছিলাম। গত বছর আমরা প্রচুর ম্যাচ আর প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমরা জেনে–‌বুঝে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, গত অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ থেকে কাউকে এবার নেব না। এটা ওদের ভালর জন্যই। ওদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতের সিনিয়র দলের হয়ে খেলে ফেলেছে। যেমন ওয়াশিংটন সুন্দর। কেউ কেউ নিয়মিত রনজি ট্রফি খেলছে। আমরা এটাই চেয়েছিলাম। চাইনি, ওরা শুধু অনূর্ধ্ব ১৯ স্তরেই পড়ে থাক। এটাই আমাকে বেশি তৃপ্তি দিচ্ছে।
 আপনি প্লেয়ারদের তৈরি করেন কীভাবে?‌ সবার জন্য একটা নির্দিষ্ট নিয়ম–‌কানুন আছে, নাকি একেকজনের জন্য একেক রকম?‌
দ্রাবিড়:‌ নিজের ভাবনা–‌চিন্তাগুলো এদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আগে দেখে নিতে চেয়েছিলাম, ওদের কী দরকার। হ্যাঁ, অবশ্যই সবার জন্য কিছু প্রাথমিক নিয়ম ছিল। কিন্তু সবাইকে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতাও আমরা দিয়েছিলাম। যেমন এই দলে দু–‌একজন আছে, যারা ম্যাচের আগে খুব বেশি ব্যাটিং করতে চায় না। নেটে হাল্কা নকিং করাটাই এদের বেশি পছন্দ। এটা এমন একটা বয়স, যখন ক্রিকেটাররা ঠিক করে, কোন রুটিনটা তাদের জন্য আদর্শ, কী করলে সাফল্য আসবে। ওদের সেই সুযোগটা দেওয়া উচিত। সারাক্ষণ যদি বলি, এটা কর, ওটা কর, তাহলে ওরা কখনোই সাবলম্বী হবে না। আমরা যতটা সম্ভব স্বাধীনতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। বিশেষ করে ম্যাচের আগের দিনগুলোয়। কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, সেটা প্রায় পুরোটাই ওদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। যদি কেউ বেশি ব্যাটিং করতে চাইত, আমরা সেই সুযোগ করে দিতাম। আগেই বললাম, কেউ কেউ সেটা চাইত না। আমরা সেই অনুমতিও দিতাম।
 মাঠের বাইরে প্লেয়ারদের কীভাবে সামলাতেন?‌ 
দ্রাবিড়:‌ ক্রিকেটের অনেকটা জুড়ে থাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সেটা রপ্ত করতে হয়। আমরা সবাইকেই সেই দায়িত্ব দিয়েছিলাম। নানারকম স্বাধীনতা এদের দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ওরা এটাও জানত, সীমারেখা কোনটা। ওরা জানত, বিসিসিআই, পরিবার, দেশ এগুলো এদের সঙ্গে জড়িয়ে। সীমারেখার মধ্যে থেকে ওদের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। ব্যাপারটা এরকম ছিল, সেখানে যা ঘটবে, তার দায়িত্ব ওদের। এই পরিবেশটা না থাকলে তো বড় হওয়া যাবে না।
 দায়িত্ববোধটা কি শেখানো যায়?‌ শুভমান গিল ফাইনালের পর বলেছিল, আপনি ম্যাচ জিতিয়ে ফেরানোর দিকে জোর দিয়েছিলেন।
দ্রাবিড়:‌ কিছু কিছু বিষয় সামনে তুলে ধরাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, যার ওপর ওরা ফোকাস করতে পারে। নানাভাবে এগুলো উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মনে আছে, ২০০২ সালে হেডিংলেতে জন রাইট লাঞ্চে এসে আমাকে বলেছিলেন, ‘‌এই উইকেটে যদি সেঞ্চুরি করতে পার, দেখবে সেটা চিরকাল মনে থেকে গেছে। দলেরও খুব কাজে লাগবে।’‌ সেটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শুভমান খুব ভাল ব্যাট করছিল। ওর ক্ষেত্রে আসল ব্যাপার হল, শেষ পর্যন্ত থেকে ম্যাচ জেতানো। এটাই ওকে শেখানোর ছিল। ওর ক্ষেত্রে এটাই ছিল শিক্ষার পরবর্তী ধাপ। আসলে এই বয়সে অনেক কিছু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। যা বলছি, তার পুরোটাই এরা মাথায় রেখে দেবে না, দিতে পারবে না। আমি বড় টিম মিটিং করা বা লম্বা বক্তৃতা দেওয়ার লোক নই। কিন্তু ওদের গাইড করতে হত, ফোকাসটা ঠিক রাখতে হত। যতই হোক, এরা সবাই টিনএজার।
 এই দলটা একদিন অনূর্ধ্ব ১৯–‌এর গণ্ডি থেকে বেরবে। কোন কোন শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা এরা পরবর্তী পর্যায়ে কাজে লাগাক, আপনি চান?‌
দ্রাবিড়:‌ ওদের আসল চ্যালেঞ্জটা এবার শুরু। এই পর্যায়ে ওরা খুব ভাল। সমবয়সীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। যখনই ওরা এই বয়সটা পেরিয়ে অনূর্ধ্ব ২৩ স্তরে গিয়ে পড়বে, বা রনজি খেলবে, তখন ওদের প্রতিযোগীদের মানটাও বদলে যাবে। অনেক অভিজ্ঞ, পেশাদার জগতে তখন লড়াই করতে হবে। সেটা করতে গেলে কিছু রদবদল দরকার। সেটা করতে না পারলে ছোট পুকুরের বড় মাছ সমুদ্রে গিয়ে যেরকম হাকপাক করে, সেরকম অবস্থা হবে। হঠাৎ মনে হবে, পুরো পরিবেশটাই কীরকম বদলে গেছে। অনেক সময়ই এই অ্যাডজাস্টমেন্টটা করতে সময় লাগে। ওদের এটা নিয়ে অনেক কিছু বলেছি। দেশে ফেরার পর কী কী অভ্যাসের মধ্যে থাকতে হবে, বুঝিয়ে দিয়েছি। অনূর্ধ্ব ১৯ স্তর মানেই অনেকটা আতুপুতু করে রাখা। অনেক প্রোটেকশন। পরের পর্যায়ে গিয়ে এই প্রোটেকশনটা যেই থাকবে না, তখন নিজেকেই অনেক কিছু করে নিতে হবে। এই বড় হয়ে ওঠাটাই শিখতে হবে।
 সেমিফাইনালের ঠিক আগে আইপিএল নিলাম ছিল। সেটা কী করে সামলেছিলেন?‌
দ্রাবিড়:‌ আমরা চাইলেই আইপিএল নিলামের ওপর থেকে ওদের নজর সরিয়ে রাখতে পারতাম। ব্যাপারটা খুব কঠিন ছিল না। কিন্তু আমি সেটা চাইনি। বলেছিলাম, এটা নিয়ে কোচিং স্টাফরা ওদের সঙ্গে কথা বলব। আইপিএল নিলাম যে আছে, সেটা তো বাস্তব। সেটা থেকে পালিয়ে কোনও লাভ হত না। তাছাড়া ওরা সবাই রক্ত মাংসের মানুষ। এর আগে হয়ত সবাই কয়েকটা নিলাম দেখেছে। কিন্তু একেবারে নিজেরাই নিলামে, এটা অনেকের কাছেই প্রথম ছিল। কেউ কেউ হয়ত কেকেআরে মিচেল স্টার্কের সঙ্গে বল করবে। কেউ হয়ত শ্রেয়স আয়ার, ঋষভ পন্থদের সঙ্গে ব্যাট করবে। এগুলো নিয়ে উত্তেজনা তো থাকবেই। তাই ওদের বলেছিলাম, ‘‌দ্যাখ, তোমরা যে নিলামের দিকে চেয়ে বসে আছ, সেটা লুকিয়ে লাভ নেই। তোমাদের মন যে ওদিকে পড়ে থাকবে, সেটা আমরা জানি। এর মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। মোটেই বলছি না, ওসব নিয়ে একদম মাথা ঘামাবে না। কিন্তু এখানে আমরা কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি, কেন এসেছি, সেটাও যেন মাথায় থাকে।’‌ ওরা এতে স্বস্তি পেয়েছিল। ওরা স্বীকার করে নিয়েছিল, মন ওদিকে যাবেই। কিন্তু কথা দিয়েছিল, ফোকাসটা নষ্ট হতে দেবে না। ওরা যে প্রত্যেকে ফোনে আইপিএল নিলাম দেখেছে, সেটা নিয়ে আমার একটুও সংশয় নেই (‌হেসে)‌। নিলাম হয়ে যেতেই ওরা আবার মন দিয়ে প্র‌্যাকটিস করেছে। মনে হয় না, এর কোনও সাইড এফেক্ট কোনও খেলায় পড়েছে। তবে অবশ্যই বিষয়টা সামলানো চ্যালেঞ্জ ছিল। তার ওপর একেবারে সেমিফাইনালের আগে পড়েছিল নিলামটা। 
 রায়ান পরাগ, ঈশান পোড়েল শুরুতেই চোট পেয়ে গেল। এরপরেও ওদের মোটিভেট করেছিলেন কী করে?‌
দ্রাবিড়:‌ রায়ানের আঙুল ভেঙে গেল। আমরা ওকে দেশে ফেরৎ পাঠিয়ে দিতেই পারতাম। কিন্তু ওকে রেখে দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলাম। ঈশানের ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত বল করে চোট পেয়ে বসল। আসলে আমরা ঈশানের সেরাটা দেখতেই পেলাম না। নিশ্চিন্ত থাকুন, ভবিষ্যতে দেখবেন। চোটটা না পেলে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারে বল করতই। এই টুর্নামেন্টটা ওর ঠিক জমল না। কিন্তু অনেক দূর যাবে। ওকেও আমরা দেশে পাঠিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু ফিজিও একটা সুযোগ নিতে চাইল। বোর্ডকেও ধন্যবাদ আদিত্য থ্যাকারেকে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে গেওয়ার জন্য। ফলে আমরা জানতাম, ব্যাক–‌আপটা আছে।‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top