নির্মলকুমার সাহা- শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই জন্ম। ডান পা ছোট এবং তাতে দুটো আঙুল নেই। মালদার ইংলিশবাজারের তপনকুমার ও মিতা সরকারের একমাত্র মেয়ে বেড়ে উঠেছে ওই প্রতিবন্ধকতা নিয়েই। এখন ২৩ বছর বয়সে এসে সেই মেয়ে মৈত্রেয়ী লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্যারা টেবিল টেনিসে আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি চিকিৎসক হওয়ার মুখে। এমবিবিএসের এখন ইন্টার্নশিপ করছেন। 
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বেশি গুরুত্ব দিলে মেয়ের আরও ক্ষতি হতে পারে। এটা শুরু থেকেই মাথায় ছিল মা–বাবার। তাই স্বাভাবিক মেয়ের মতোই মৈত্রেয়ীকে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছেন তপনকুমার ও মিতা। ৬/‌৭ বছর বয়সেই মেয়েকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন স্থানীয় ঝঙ্কার ক্লাবে টেবিল টেনিস খেলায়, কোচ সরফরাজ নওয়াজের কাছে। ২০০৯ সাল থেকে ওই কোচের কাছেই মৈত্রেয়ী আছেন মালদা ক্লাবে। আছেন আর এক কোচ শুভময় চ্যাটার্জি। মৈত্রেয়ী সরকার বললেন, ‘‌কলকাতায় যখন যাই, ওয়াইএমসিএ–তে প্র‌্যাকটিস করি মান্তু মুর্মুর কাছে। এই তিন কোচের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।’‌ 
কোচদের পাশাপাশি মৈত্রেয়ীর খেলাধুলোয় এতটা এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে আর একজনের কৃতিত্বও। তিনি প্রশান্ত কর্মকার। মালদা ইনডোর স্টেডিয়ামে প্রশান্তর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল মৈত্রেয়ীর। প্যারা গেমসে অংশ নিতে বলেছিলেন প্রশান্ত। কী কী করতে হবে, সে সবও বলে দিয়েছিলেন। 
ডান পা আড়াই ইঞ্চি ছোট। ওই পায়ে মাত্র তিনটি আঙুল। তাই নিয়েই শুধু টেবিল টেনিস খেলা নয়, নাচেও রীতিমতো পারদর্শী মৈত্রেয়ী। নাচেও বাবা–মা ভর্তি করে দিয়েছিলেন ছোটবেলাতেই। ভরতনাট্যম শিখেছেন অনেকদিন। এখন অবশ্য আর নাচে নেই। সেটা সময়ের অভাবেই। পাশাপাশি পিছিয়ে থাকেননি লেখাপড়ায়ও। শৈশব থেকেই মেধাবী ছাত্রী। লক্ষ্য ছিল ডাক্তার হওয়া। সেই লক্ষ্যও পূর্ণ হওয়ার পথে। 
২০১৩ সালে বার্লো গার্লস হাই স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন কল্যাণীর কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড জেএনএম কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে। সেখান থেকেই মৈত্রেয়ী ডাক্তারি পাশ করার মুখে।
মৈত্রেয়ীর বাবা তপনকুমার সরকার বলছিলেন, ‘‌শারীরিক সমস্যার ব্যাপারটা ওকে বুঝতেই দিতে চাইনি। এতে ও মানসিক দিক দিয়ে ভেঙে পড়ত। আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই নর্মাল ছেলেমেয়ের মতোই ওকে বড় করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি। নর্মাল ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই খেলাধুলো, লেখাপড়া, নাচ, হই হট্টগোল।’‌
ডান পা আড়াই ইঞ্চি ছোট হলেও ওঁর হাঁটাচলার সময় সেটা বুঝতে পারা যায় না। স্বাভাবিকভাবে হাঁটার জন্য ডান পায়ে বড় হিলের জুতো পরেন। টেবিল টেনিস খেলার সময়ও তাই। ফলে প্যারা বিভাগে অংশ নিলেও সমানতালে অনুশীলন করেন নর্মাল ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই। 
প্যারা টেবিল টেনিসে ৯টি জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জিতেছেন ৭টি সোনা ও দু‌টি রুপো। অংশ নিয়েছেন ৫টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। সেখানে জিতেছেন একটা করে রুপো ও ব্রোঞ্জ পদক। যা শোভা পাচ্ছে মালদা ৩ নম্বর গভর্নমেন্ট কলোনির কমলা অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটে। ডাক্তারি পড়তে পড়তেও ক্লান্তিহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন টেবিল টেনিস খেলা। মৈত্রেয়ী বলছিলেন, ‘‌পাশ করার পর ডাক্তারি করতে করতেও চালিয়ে যাব টিটি খেলা। মনে হয় কোনও সমস্যা হবে না।’‌ 
৫টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও এখনও নামা হয়ে ওঠেনি প্যারা কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস বা প্যারালিম্পিকে। এই এপ্রিলেই ওঁর কমনওয়েলথ গেমসে নামার স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে। প্যারা টেবিল টেনিসের যে গ্রুপে (‌এফ ৯)‌ মৈত্রেয়ী অংশ নেন, সেটা আগের কমনওয়েলথ গেমসে ছিল না। এবার অস্ট্রেলিয়ায় হতে যাওয়া কমনওয়েলথ গেমসে সেটা আছে। ভারতীয় দলে সুযোগও পেয়েছেন মৈত্রেয়ী। ওঁর এবার লক্ষ্য কমনওয়েলথ গেমসের পদক। এখন যার জন্য চলছে জোর প্রস্তুতি। 
পরশু আন্তর্জাতিক নারী দিবস। তার আগে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন এই লড়াকু মেয়েকে। যাঁর লড়াই শুধু শারীরিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা নয়, স্বাভাবিক মেয়েদের কাছেও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top