নির্বাসন ফেরত সিনিয়র ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু সাক্ষাৎকারের শর্ত, নির্বাসন নিয়ে কোনও বিতর্কিত প্রশ্ন করা যাবে না। প্রশ্ন সাজালেন নির্মলকুমার সাহা

অনেক ঝড়ঝাপ্টার পর সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। ঘটনাটা জীবনে কতটা পরিবর্তন ঘটাল?‌ আদৌ ঘটাল কি? 
সুতীর্থা মুখার্জি:‌ একবার সিনিয়র ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়েই জীবনে কী আর পরিবর্তন ঘটবে!‌ বলতে পারেন, এটা জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। আমার বেশ কিছু টার্গেট আছে। ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা সেই পথে আমাকে খানিকটা এগিয়ে দিল। বলা যায়, নিজেকে মোটিভেট করার মতো কিছুটা রসদ পেলাম।
‌‌ ‌ন্যাশনালে যাওয়ার আগে চ্যাম্পিয়ন হবেন ভেবেছিলেন?‌
সুতীর্থা:‌ ভাল পারফর্ম করতে হলে লক্ষ্যটা উঁচুতেই রাখতে হয়। এটা সকলের ক্ষেত্রেই সত্যি। আমি সেই মানসিকতা নিয়েই খেলি। ন্যাশনালের আগে থানেতে ওয়েস্ট জোন টেবিল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ফলে মনোবলটা বেড়ে গিয়েছিল। তখনই মনে হয়েছিল, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ আছে। যদিও সারাক্ষণ সেটা নিয়ে ভেবে নিজেকে বাড়তি চাপে ফেলতে চাইনি। ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চেয়েছি। জিততে হবে, এই মনোভাব নিয়ে প্রত্যেকটা ম্যাচ খেলতে নেমেছি। ফাইনালেও আমার মানসিকতা সেরকমই ছিল। বলতে পারেন, পুরো টুর্নামেন্টেই আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। 
‌‌ ‌এবার ন্যাশনালের জন্য আলাদা কোনও প্রস্তুতি?‌
সুতীর্থা:‌‌ আমি তো অনেকদিন ধরেই নৈহাটির ঋষি বঙ্কিম টেবিল টেনিস অ্যাকাডেমিতে মিহির ঘোষের কাছে ট্রেনিং নিই। ওটা ছিলই। পাশাপাশি কলকাতায় গিয়ে সৌম্যদীপ রায়ের অ্যাকাডেমিতে স্পেশাল ট্রেনিং নিয়েছি। ওখানে পৌলমী ঘটকও ট্রেনিংয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছেন। কলকাতার ওই ট্রেনিংটা আমার খুব কাজে লেগেছে। মিহির ঘোষের পাশাপাশি ওই দু’‌জনের কাছেও তাই আমি কৃতজ্ঞ। 
‌‌ ‌কীভাবে টেবিল টেনিসে এলেন?‌ পরিবারে আগে কেউ খেলেছেন?‌ 
সুতীর্থা:‌‌ নাহ্‌, আমার পরিবারের কেউ আগে কখনও টেবিল টেনিস খেলেননি। ছোটবেলায় খুব মোটা ছিলাম। বাবা–মা তাই ঠিক করেছিলেন, আমাকে খেলাধুলোয় দেবেন। যাতে পরিশ্রম করে ফ্যাট কমানো যায়। মা–র পছন্দ ছিল ইনডোর গেম। তার মধ্যে আবার প্রথম পছন্দ ব্যাডমিন্টন। এটা ভেবেই নৈহাটিতে কোনও ব্যাডমিন্টন ট্রেনিং সেন্টার খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু ওখানে ব্যাডমিন্টন শেখানোর কোনও সেন্টার ছিল না। খোঁজ করতে করতে ব্যাডমিন্টন শেখানোর জায়গা না–পেয়ে জানতে পারেন ঋষি বঙ্কিম টিটি অ্যাকাডেমির কথা। তখন টিটি–তেই ভর্তি আমাকে করে দেন। এভাবেই টেবিল টেনিসে জড়িয়ে পড়া। এখন তো বাবা অভিজিৎ মুখার্জিও টেবিল টেনিসের সঙ্গে জড়িয়ে। বাবা  এখন টিটি–র ন্যাশনাল আম্পায়ার। আর মা নীতা মুখার্জি সবসময় টেবিল টেনিসে আমার সঙ্গী। আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। ভাল–খারাপ সবসময়েই মা আমার পাশে থাকেন। 
‌‌ ‌টেবিল টেনিস না খেললে বা টেবিল টেনিসে সাফল্য না পেলে শুরুর সময় বিকল্প কোনও পথ খোলা রেখেছিলেন?‌ 
সুতীর্থা:‌‌ ক্লাস টু–তে যখন পড়ি, বয়স ৬–৭ বছর, তখন থেকেই টেবিল টেনিসে। খেলা শুরুর পর কখনও ব্যর্থতার কথা ভাবিনি। এর আগে সাব–জুনিয়র আর জুনিয়রে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সবসময় টার্গেটটা উঁচুতেই রেখেছি। ভাল–মন্দ মিলিয়ে টেবিল টেনিসে বেশ আছি। কাজেই বিকল্প কিছু কখনও ভাবার দরকার হয়নি।
‌‌ ‌নির্বাসনে থাকার সময়েও নয়?‌ 
সুতীর্থা:‌ নাহ্‌, তখনও অন্যকিছু ভাবিনি। শুধু প্রচণ্ড মন দিয়ে প্র‌্যাকটিস করে গিয়েছি। তখন আমার একটাই লক্ষ্য ছিল— আবার খুব ভালভাবে বোর্ডে ফিরতে হবে। মনে হয় সেটা করতে পেরেছি। 
‌‌ ‌সিনিয়র ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন‌ হওয়ার পর তো আরও একটা ধাক্কা। ভিসা সমস্যায় পর্তুগাল যাওয়া হল না! খারাপ লাগছে না?‌ 
সুতীর্থা:‌ খারাপ লাগলেও কিছু করার তো নেই। তাই ওই আগের মতোই  বলছি, মন দিয়ে প্র‌্যাকটিসটা করে যাচ্ছি। পর্তুগালে যেতে না পারা মানে সব শেষ হয়ে গেল, তা তো নয়। পরে তো আরও অনেক টুর্নামেন্ট আছে। সেগুলোয় ভাল খেলার জন্য তৈরি হচ্ছি। 
‌‌ ‌টেবিল টেনিস ছাড়া অন্য কোনও খেলায় আগ্রহ?‌ 
সুতীর্থা:‌ ব্যাডমিন্টন, টেনিস, ক্রিকেট দেখতে ভাল লাগে। টিভিতে সময় পেলে একটু–আধটু দেখি। আসলে প্র‌্যাকটিস আর টুর্নামেন্ট নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকি। বেশি টিভি দেখার সময়ও পাওয়া যায় না। আর রাত জেগে টিভি দেখা তো এক্কেবারেই নয়! 
‌‌ ‌ব্যাডমিন্টন–টেনিস–ক্রিকেটে প্রিয় তারকা?‌
সুতীর্থা:‌ দু’‌জন আমাদের দেশের। ক্রিকেটে বিরাট কোহলি আর ব্যাডমিন্টনে পি ভি সিন্ধু। আর একজন বিদেশের। রজার ফেডেরার। 
‌‌ ‌সিনেমা–টিনেমা দেখেন?‌ 
সুতীর্থা:‌ সিনেমা বা সিরিয়াল দেখার কোনও নেশা আমার নেই। তবে স্পোর্টসম্যানদের নিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটা বায়োপিক দেখেছি। মিলখা সিং, মেরি কম, শচীন তেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনিকে নিয়ে তৈরি সিনেমাগুলো দেখেছি। 
‌‌ ‌দেখতে দেখতে কখনও মনে হয়নি, আপনাকে নিয়েও যদি কোনওদিন ওইরকম বায়োপিক তৈরি হয়?
সুতীর্থা:‌ ওইরকম দিন যদি কখনও আসে, খুশিই হব। তবে তার জন্য অনেক, অনেক সাফল্য পেতে হবে। আমি অবশ্য অনেক, অনেক সাফল্যই পেতে চাই। সেজন্য যথাসম্ভব পরিশ্রম করে চলেছি। ভবিষ্যতেও করব। তবে জানি, ধাপে ধাপে এগোতে হবে। সামনে কমনওয়েলথ গেম্‌স, এশিয়ান গেম্‌স। এখন লক্ষ্য ভারতীয় দলে ঢোকা। তারপর টার্গেট টোকিও অলিম্পিক। ‌‌শুধু দলে ঢোকা নয়। টার্গেট পদক পাওয়ার।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top