মুনাল চট্টোপাধ্যায়: গত মরশুমে আই লিগে মোহনবাগানকে মেসনের জোড়া গোলে হারিয়েছিল রিয়েল কাশ্মীর। এবার মেসন নেই। কাশ্মীরের খেলাতেও নেই সেই ঝাঁজ। 
১৪ মিনিটে চামোরোর গোলে বাগান এগিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল ওই গোলেই জিতে ডুরান্ড ফাইনালে গোকুলামের মুখোমুখি হবে তারা। কিন্তু পিকচার তখনও বাকি ছিল। সংযুক্তি সময়ের ১ মিনিট বাকি থাকতে লাভডের ক্রসে আইভরি কোস্টের ক্রিজোর হেডে রিয়েল কাশ্মীর ১–‌১ করতেই ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়। অথচ ক্রিজোকেই প্রথমে তালিকায় রাখেনি কাশ্মীর। তবে গোল খেয়েও ছন্দ নষ্ট করেনি বাগান। অতিরিক্ত সময়ের ৩ মিনিটে গঞ্জালেসের ২০ গজের ঠিকানা লেখা পাসে সুহেরের গোলে আবার এগিয়ে যাওয়া। রোমারিওর বদলে এসে সুহের ও জোসেবার জায়গায় নেমে ম্যাচ ঘোরালেন গঞ্জালেস। ১১২ মিনিটে গঞ্জালেসের থ্রু থেকেই জোরালো উঁচু শটে সুহেরের দ্বিতীয় গোল। ৩–‌১ ফলে জিতে ডুরান্ড ফাইনালে মোহনবাগান। ১০ বছর পর। গোকুলাম গোলকিপার কেরলের উবেদের নায়ক হওয়ার দিনে আর এক কেরালাইট সুহেরও নায়ক। তিনিও উবেদের মতো ইস্টবেঙ্গল বাতিল। 
ম্যাচ শুরুর আগেই নাটক। কাশ্মীর দলের হয়ে অনুশীলন করতে দেখা যায় কোচ রবার্টসনের ছেলে মেসনকে। তাঁর নামও ছিল তালিকায়। নজরে পড়ে মোহনবাগান কর্তাদের। ম্যাচ কমিশনারের নজরে আনেন। মেসন ডুরান্ডের জন্য  নথিভুক্তই নন। রবার্টসনও এর আগে সে–কথা বলেছিলেন। তারপরও তালিকায় কেন মেসন, দুর্বোধ্য। মেসনের জায়গায় ঢোকেন ক্রিজো। 
এতে রিয়েল কাশ্মীর দলের ফুটবলারদের ফোকাস নড়ে গেলে, বা রবার্টসনের প্ল্যানিং নষ্ট হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ গ্রুপে চনমনে মেজাজে থাকা রিয়েল কাশ্মীর এদিন শুরু থেকেই ম্রিয়মাণ। সচরাচর স্ট্রাইকিং লাইনে খেলেন অন্যতম সেরা অস্ত্র দানিশ। তাঁকে একটু পেছন থেকে খেলিয়ে রবার্টসন প্রতিপক্ষকে আরও বেশি করে ঘাড়ে বসার সুযোগ করে দিলেন। 
মহমেডানের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের পর চেনা ছন্দে সেভাবে পাওয়া যায়নি সবুজ–মেরুন ব্রিগেডকে। ডুরান্ডের বাকি ম্যাচ জিতলেও লিগের দুটো ম্যাচের একটাতে হার, একটা ড্র। নিজেদের মাঠে বাগানের খেলা দেখে চিন্তায় ছিলেন সদস্য–‌সমর্থকেরা। আশঙ্কা নিয়ে যুবভারতীতে এসেছিলেন, একইসঙ্গে আশাও ছিল দল ছন্দে ফিরবে। কিবু ভিকুনার দল হতাশ করেনি। বাগান কোচ থেকে ফুটবলাররা বারবার বলে এসেছেন, তাঁরা জমিতে বল রেখে ছড়িয়ে খেলতে ভালবাসেন। সেটা নিজেদের ছোট, বৃষ্টিভেজা ভারী মাঠে সম্ভব নয়। যুবভারতীর সবুজ ঘাসে ভরা মসৃণ মাঠে সেরাটা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে রিয়েল কাশ্মীরকে শুরু থেকেই কোণঠাসা করে দেয় বাগান। দৃষ্টিনন্দন পাসিং ফুটবলের ফুলঝুরি। এতদিন নড়বড়ে মনে হওয়া বাগান রক্ষণ এদিন আগাগোড়া জমাট। চার ব্যাকের সামনে সাহিলকে রেখে কাশ্মীরের আক্রমণটাই থামিয়ে দেন কোচ ভিকুনা নিজেদের মাঝমাঠে। 
পাল্টা বাগানের আক্রমণ তুলে আনার ক্ষেত্রে মাঝমাঠে নেতৃত্ব দিলেন স্প্যানিশ জোসেবা। ৭৪ মিনিট পর্যন্ত মাঠে থাকতে তাঁর পায়ের জাদুতে ও দৃষ্টিনন্দন পাসের ঝলকানিতে যে শুধু বাগান সমর্থকেরাই মুগ্ধ হয়েছেন তাই নয়, প্রতিপক্ষ ফুটবলাররাও সম্মোহিত হয়ে থাকতে পারেন। নইলে জোসেবা সতীর্থদের সঙ্গে পাস খেলে উঠলেই কাশ্মীর রক্ষণে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠবে কেন?‌ জোসেবার খেলার একটা বড় দিক হল, তিনি সুযোগ পেলেই বক্সের বাইরে থেকে শট নেন। ১৪ মিনিটে তাঁর নেওয়া দর্শনীয় শট অনবদ্য তৎপরতায় কাশ্মীর গোলকিপার লাচেনপা ফিস্ট করে না বের করলে, তখনই বাগান এগিয়ে যেত। গোলটা এল অবশ্য সালভা চামোরোর দুরন্ত হাফভলি থেকে ৪২ মিনিটে। জোসেবার বাড়ানো বল বাঁদিক থেকে গুরজিন্দার কাশ্মীরের বক্সে সেন্টার করলে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের মাথা টপকে চামোরোর সামনে পড়ে। চামোরো মাপা শটে তা দ্বিতীয় পোস্টের কোণ দিয়ে জালে জড়াতে ভুল করেননি। মহমেডানের বিরুদ্ধে হেডে দু’‌গোল করার পর কাশ্মীরের বিরুদ্ধে চামোরো আবার গোল পেলেন। ইস্টবেঙ্গলকে শেষমুহূর্তে গোল হজম করে পরে টাইব্রেকারে ম্যাচ হাতছাড়া করতে দেখেছিলেন। ভিকুনা তাই কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। প্রতিপক্ষ শেষদিকে তেড়েফুঁড়ে আসবে বুঝেই জোসেবাকে তুলে নিয়ে স্প্যানিশ স্টপার গঞ্জালেসকে নামিয়ে রক্ষণের জমাট ভাব বাড়িয়েছিলেন। তাতেও লাভ হল না। 
শেষমুহূর্তের অসতর্কতায় ম্যাচের একমাত্র ভুলের খেসারত দিয়ে গোল হজম বাগানের। তবে বাগানে স্বস্তি ফিরতে দেরি হয়নি ৯৩ মিনিটে সুহের গোল করায়। এরপর চামোরো সামনে একা গোলকিপারকে পেয়েও হাতে না মেরে বসলে অতিরিক্ত সময়ে চাপে থাকতে হত না তাদের। ১০০ মিনিটে গোললাইনের সামনে থেকে বল ফিরিয়ে দলের নিশ্চিত পতন রোখেন মোরান্তে। সুহেরের নাছোড়বান্দা মনোভাবের গোলে শেষপর্যন্ত বাজিমাত বাগানের। তাঁর আর একটি শট পোস্টে না লাগলে সুহের হ্যাটট্রিক করতেন। এর সঙ্গে বড় প্রাপ্তি বাগানের ১২০ মিনিটের হার না–মানা মনোভাব।
দলের পারফরমেন্সে সন্তুষ্ট ভিকুনা আবার ডুরান্ডের নিয়ম নিয়ে অসন্তুষ্ট। ইস্টবেঙ্গল কোচ আলেজান্দ্রোর সুরে সুর মিলিয়েই বাগান কোচ বলেন, ‘‌ফিফার নিয়ম মেনে কেন অতিরিক্ত সময়ের খেলায় চতুর্থ বদল করতে দেওয়া হচ্ছে না সেটা বোধগম্য হচ্ছে না।’‌ তবে ফুটবলারদের প্রশংসা করে ভিকুনা বলেন, ‘‌দলের খেলায় আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট। ওরকম সময়ে গোল হজম করলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত সময়ে প্রত্যেকে খুব ভাল খেলেছে।’‌
মোহনবাগান: শঙ্কর, আশুতোষ, কিমকিমা, মোরান্তে, গুরজিন্দার, সুরাবুদ্দিন, রোমারিও (সুহের)‌, সাহিল, জোসেবা (মোরান্তে)‌, নওরেম (‌ইমরান)‌, চামোরো।‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top