‌আজকালের প্রতিবেদন: বিশ্ব টেনিসের আধুনিক যুগের একটি অধ্যায়ের অবসান হল। টেনিসকে বিদায় জানালেন মারিয়া শারাপোভা। খানিকটা অভিনবভাবেই ‘‌ভোগ’‌ এবং ‘‌ভ্যানিটি ফেয়ার’‌ পত্রিকায় কলাম লিখে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন ৫ বারের গ্র‌্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন এই মহাতারকা।
খেলাধুলোর জগতে গ্ল্যামারের অন্যতম সেরা আইকন শারাপোভা লিখেছেন, ‘‌শুধুমাত্র যার জন্য জীবনটা পরিচিত, তাকে বিদায় জানাতে হয় কীভাবে?‌ ছোটবেলা থেকে যে কোর্টে প্র‌্যাকটিস করে বেড়ে ওঠা, যে খেলা থেকে অনুচ্চারিত কান্না এবং অনির্বচনীয় আনন্দ পাওয়া, ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে খেলার সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক গড়ে তোলা, তা থেকে সরে আসতে কেমন লাগে?‌ জানি না। আমি এই জগতে সদ্যোজাত। আমাকে ক্ষমা করবেন। টেনিস, তোমাকে গুডবাই।’‌
গত আগস্টে ইউএস ওপেনে অবসরের ভাবনা উঁকি দিয়েছিল। শারাপোভা লিখেছেন, ‘সেদিন কোর্টে নামার আধ ঘণ্টা আগে আমার কাঁধে ম্যাসাজ করাচ্ছিলাম। কাঁধের চোট আমার কাছে নতুন নয়। অনেকবার অপারেশন হয়েছে। কিন্তু সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল, শরীরটা বোধ হয় আর নিচ্ছে না।’‌
লেখনীতে আবেগমথিত শারাপোভা,‌ ‘জীবন টেনিসে সঁপে দিয়ে দেখলাম, টেনিস আমাকে জীবন দিয়েছে। প্রতিদিন মিস করব। কাকভোরে ঘুম থেকে ওঠা, আগে বাঁপায়ে জুতো গলানো, দিনের প্রথম বলটা মারার আগে কোর্টের গেট বন্ধ করা— সব মিস করব। বাবার সঙ্গে প্র‌্যাকটিস কোর্টের বেঞ্চে বসা মিস করব। হারা, বা জেতার পর সেই হ্যান্ডশেকগুলো মিস করব। আর মিস করব প্রতিপক্ষদের। জানি না তারা জানে কিনা, তারাই আমার সেরাটা নিংড়ে নিয়েছে।’‌
কোর্টের উল্টোদিকের সঙ্গে মাশার রসায়নটা সত্যিই অজানা থেকে যাবে। ২০১৬ সালের মার্চে সেই কুখ্যাত স্বীকারোক্তি, ‘‌গত ১০ বছর ধরে মেলডোনিয়াম (‌নিষিদ্ধ ড্রাগ)‌ নিচ্ছি’‌–‌র পর যখন ১৫ মাসের নির্বাসন কাটিয়ে ফিরেছিলেন, তখন অনেক প্রতিপক্ষই তাঁকে কয়েকটি প্রতিযোগিতায় ওয়াইল্ড কার্ড দেওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আর বেশ কিছু প্রতিযোগিতার কর্তারা তাঁকে খেলার অনুমতিই দেননি।‌ 
জার্মানিতে সেই প্রত্যাবর্তন প্রতিযোগিতায় শারাপোভা সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন, তারপর আর কখনোই নিজেকে নিজের উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেননি। প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর একমাত্র ট্রফি ২০১৭–‌র অক্টোবরে চীনের একটি নিম্ন স্তরের প্রতিযোগিতা। গ্র‌্যান্ড স্লামের মঞ্চে দেখতে গেলে ২০১৮–‌র ফ্রেঞ্চ ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর শেষ তিনটি প্রতিযোগিতায় প্রথম রাউন্ডেই হার।
অথচ, ২০০৪ সালে লম্বা, রোগা এক রুশ সপ্তদশী যখন শীর্ষবাছাই সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে উইম্বলডনে চুমু খেয়েছিলেন, তখন মনে হয়নি, এই চুম্বনের সংখ্যাটা পাঁচে থেমে যাবে। সেই উইম্বলডন জয় নিয়ে আজকের ৩২ বছরের শারাপোভা লিখেছেন, ‘‌অনেক পরে মনে হয়েছে, শুরুটা উইম্বলডনে হওয়ায় ভাল হয়েছিল। তখন আমি সরল, সাধাসিধে ১৭ বছরের মেয়ে, স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছি। তখন বুঝিনি উইম্বলডন জেতার মাহাত্ম্য। সেটা অনেক বড় হয়ে বুঝেছি। আর তখন যে বুঝিনি, তার জন্য আমি আনন্দিত।’‌
ছয় বছর বয়সে রাশিয়ার নিয়াগান থেকে আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে আসা শারাপোভা ৪টি গ্র‌্যান্ড স্লামই জেতেন ২০০৪ থেকে ২০১২–‌র মধ্যে। দ্বিতীয় ফ্রেঞ্চ ওপেন ২০১৪ সালে। আমেরিকা পাড়ি দেওয়া নিয়ে শারাপোভা বুধবার লিখেছেন, ‘‌পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ফ্লোরিডায় এসেছিলাম বাবার হাত ধরে। তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীটা কী বিশাল। এয়ারপ্লেন, এয়ারপোর্ট, আমেরিকার বিস্তৃতি, সব কিছু খুব বড় মনে হয়েছিল— আমার বাবা, মা–‌র স্বার্থত্যাগের মতো।’‌ সেই স্বার্থত্যাগ শারাপোভার টেনিস কেরিয়ারে শুরুতে দিয়েছে সোনার ফসল। ২০০৫ সালের আগস্টে র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে চলে আসেন। ফোর্বস পত্রিকার বিচারে টানা ১১ বছর সবথেকে ধনী মহিলা খেলোয়াড় ছিলেন। সাফল্যের রহস্য জানাতে গিয়ে শারাপোভা লিখেছেন, ‘‌কখনও পেছনে তাকাইনি, কখনও সামনেও তাকাইনি। শুধু নিজেকে ঘসে, মেজে তৈরি করেছি।’‌
নির্বাসিত হওয়ার ঠিক আগের বছর আয় ছিল ৩ কোটি পাউন্ড। তারপর?‌ ডোপ বিতর্ক নিয়ে শুধু লিখেছেন, ‘‌টেনিস আমার কাছে পাহাড়ের মতো। পৌঁছনোর পথে ফুল ছিল, কাঁটাও ছিল। কিন্তু পাহাড়ের শৃঙ্গ থেকে যে দৃশ্যগুলো দেখেছি, অবিশ্বাস্য।’‌ তবু এই তথ্যটা মাশার পাহাড়ে থেকে যাবে— ২০০৫, ২০০৭, ২০০৮, ২০১২ সাল এক নম্বরে থেকে যিনি শেষ করেছেন, তাঁর কেরিয়ারের শেষটা হল ৩৭৩ নম্বরে থেকে।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top