আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ ব্ল্যাক ২০২০। তোমাকে ধিক্কার। একে একে চলে গেছেন পিকে ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামী। এবার চলে গেলেন ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদোনা। আচমকা এল দুঃসংবাদ। অতিরিক্ত মদ্যপান যে সমস্যা ডেকে আনতে পারে, তা আগেই বলেছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক। কিন্তু তিনি মারাদোনা তো। শুধু একজন ফুটবলার নন। এর বাইরেও রয়েছে তাঁর একাধিক বর্ণময় চরিত্র। কখনও তিনি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। কখনও ড্রাগের নেশায় কলঙ্কিত মহানায়ক। 
১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ দেখেছিল মারাদোনাকে। বাঁ–পায়ের শিল্পে আলোড়িত হয়েছিল বিশ্ব। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আটজন ফুটবলারকে কাটিয়ে গোল করেছিলেন। সেই ম্যাচই বিখ্যাত হয়ে আছে ‘‌হ্যান্ড অফ গড’‌ এর জন্য। ময়দানের প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসু তো বলেই দিলেন, ‘‌২০২০ সালটা সত্যিই আমাদের কাছে বিভীষিকা। না হলে একের পর এক আপনজন হারানোর খবর আসে!‌’‌ সত্যিই মারাদোনা আপনজনই তো।
যখন কলকাতায় এসেছিলেন, আপন করে নিয়েছিলেন এই শহরের প্রতিটা মানুষকে। ২০০৮ সালে মহেশতলায় এক অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‌এখান থেকে আমার বাড়ি অনেক দূরে। কিন্তু এই শহরেও আমার প্রতি এত ভালবাসা দেখে আমি মুগ্ধ। কথা দিচ্ছি ফের আসব এই কলকাতায়।’‌ ব্ল্যাক ২০২০। তোমাকে ধিক্কার। তারপর ২০১৭ সালেও একবার এসেছিলেন কলকাতায়। মাত্র ৬০ বছরেই তিনি ‘‌ছিলেন’‌ হয়ে গেলেন। তাঁর নামের আগে কিংবা পরে ‘ছিলেন’ কথাটা লিখতে বাধছে। 
১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর জন্ম বুয়েনস আয়ার্সে। মৃত্যুও সেখানেই। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির ফুটবলারকে লোকে মনে রাখবে ড্রিবলিং, পাসিংয়ের জন্য। জাতীয় দলে ১০ নম্বর জার্সি পড়তেন। বোকা জুনিয়র্স, বার্সিলোনা, নাপোলির মতো বিখ্যাত ক্লাবে খেলেছেন। 
দেশের হয়ে ৯১ ম্যাচে করেছেন ৩৪ গোল। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেরা ফুটবলারের সম্মান পেয়েছিলেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারের পর কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ড্রাগ নেওয়ার অপরাধে তাঁকে ছিটকে যেতে হয়েছিল।
কোচ হিসেবে সফল হতে পারেননি মারাদোনা। ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালেই জার্মানির কাছে যাত্রাভঙ্গ হয়। 
টুইটে মারাদোনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সৌরভ গাঙ্গুলি, রাহুল গান্ধীরা। কিংবদন্তির প্রয়াণে শোকাহত সবাই। 
১৯৮৪ সালে বিয়ে করেছিলেন ক্লদিয়াকে। তিন মেয়ে তাঁর। একাধিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু ফুটবলের রাজপুত্রর ক্যারিশমা তাতে ম্লান হয়নি। 
সত্যিই কিংবদন্তি। তিনি ফুটবলের ঈশ্বর। পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন গোটা বিশ্বকে। শুধু তো ফুটবলার হিসেবে নয়, কোচ হিসেবেও তিনি উজাড় করে দিয়েছিলেন নিজেকে। কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। গত কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ ছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। 
নিজের ৬০ তম জন্মদিন পালনের কয়েকদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মারাদোনা। তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, মারাদোনা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর শরীরে করোনার প্রভাবও রয়েছে। সেসব গুজব উড়িয়ে দিয়ে তাঁর চিকিৎসক লিপোলদো লুকি জানান, মারাদোনার শরীরে করোনার কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তিনি হৃদরোগেও আক্রান্ত হননি। তাঁর অসুস্থতা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি। তাঁকে গ্রাস করেছে অবসাদ। যার প্রভাব পড়ছে তাঁর শরীরের উপরও।
পরে জানা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তারপর থেকে হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন ফুটবল রাজপুত্র। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগে ছিল গোটা বিশ্বের ফুটবল মহল। লা প্লাতার সেই হাসপাতালের বাইরে রোজ জড়ো হতেন অনুগামীরা। অবশেষে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হাসপাতাল থেকে রিহ্যাব সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় দিয়েগোকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অনেকটাই সুস্থ তিনি। তবে তাঁর অ্যালকোহল নির্ভরতা ছাড়ানো প্রয়োজন। রিহ্যাব থেকে বাড়িও ফিরেছিলেন বলে খবর। কিন্তু বুধবারই এল দুঃসংবাদ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ী মহাতারকা নেই, এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউ। 
সত্যিই মারাদোনা আর নেই!‌ 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top