সৌমিত্র কুমার রায়- সাত ও আটের দশকের ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আড্ডায় এখনও একটাই নাম বারবার ঘুরেফিরে আসে। নামটা যে শুধু নাম নয়, নামটা ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাসে মিশে রয়েছে আবেগ হিসেবে। ভালবাসা হিসেবে। নামটা উঠলেই সেই সমর্থকরা নস্ট্যালজিক হয়ে পড়েন। উল্টোদিকে, ইস্টবেঙ্গল প্রসঙ্গ উঠলে তিনিও এক লহমায় আবেগতাড়িত। তঁার মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে কতই না পুরনো স্মৃতি। পুরনো সব ঘটনা। 
ইস্টবেঙ্গলের জীবনকৃতি সম্মান পাওয়ার থেকেও মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের কাছে সেরার সেরা স্মৃতি ইস্টবেঙ্গল জার্সিতে প্রথম দিন মাঠে নামার অভিজ্ঞতা। ছোটবেলা থেকেই ইস্টবেঙ্গলের অন্ধভক্ত। তারপর ইস্টবেঙ্গল জার্সি গায়ে চাপানোর প্রসঙ্গ উঠতেই এখনও রোমাঞ্চিত মনোরঞ্জন। ক্লাবের তরফে জীবনকৃতি হিসেবে মনোরঞ্জন ও ভাস্কর গাঙ্গুলির নাম সরকারি ঘোষণার পর ‘আজকালের’ সামনে খোলামেলা মনোরঞ্জন। 
ইস্টবেঙ্গলে তঁার পরিচিতি মনোরঞ্জন নয়, লাল–হলুদ তাঁকে ডাকত ‘আমাগো মনা’ বলে। হ্যাঁ, মনোরঞ্জন আর ইস্টবেঙ্গল একটা সময়ে একই মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। ১৯৮১ সালে ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক নির্বাচিত হলেও, লাল–হলুদের যত বছর খেলেছেন তিনিই ছিলেন আসল নেতা। ১৯৭৭ সালে ইস্টবেঙ্গলে প্রথম সই। তারপর সময় যত গড়িয়েেছ, ইস্টবেঙ্গলে মনোরঞ্জন হয়ে উঠেছেন ‘আমাগো মনা’‌। একেবারে নিখাদ ঘরের ছেলে। সেই ঘরের থেকে যখন কোনও সম্মান মেলে তার অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে অভিভূত মনোরঞ্জন, ‘ইস্টবেঙ্গলের এই সম্মান আমার কাছে অন্যরকম একটা ব্যাপার, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তার থেকেও বিরাট ব্যাপার ইস্টবেঙ্গলে খেলা। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম এই ক্লাবে খেলব। ভগবান আমাকে কোনও বর দিতে চাইলে আমি বলতাম ইস্টবেঙ্গলে খেলব। মন থেকে চেয়েিছলাম বলেই হয়তো এতটা পথ পেরোতে পেরেছি।’
টানা ১৪ বছর ইস্টবেঙ্গলে খেলেছিলেন। পরে আরও একটা বছর। লাল–হলুদে খেলোয়াড় জীবনে প্রথম বছরটা কাটানোর পর কোনওদিন টিম লিস্টই দেখতেন না। দেখার প্রয়োজন পড়ত না। মনোরঞ্জনের আত্মবিশ্বাস বাকিদের থেকে ঢের গুণ বেশি ছিল। মনোরঞ্জনের কথায়, ‘ঈশ্বর আমাকে দুটো জিনিস দিয়েছিলেন। স্বাস্থ্য এবং মনের জোর। এই দুটোই ছিল আমার খেলোয়াড় জীবনের অস্ত্রাগারের প্রধান অস্ত্র। তা নিয়েই লড়ে গেছি। আমি কীরকম খেলেছি, সেটা আমার থেকে সমর্থকরা ভাল বলতে পারবেন। কিছু পাওয়ার আশায় খেলিনি, ভাললাগা থেকে খেলেছি। ইস্টবেঙ্গলের থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি।’ মনোরঞ্জনের মনের জোরের নিদর্শন রয়েছে প্রচুর। জ্বর নিয়ে পুরো ম্যাচ খেলা। ভাঙা নাক নিেয়ও লড়াই চালিয়ে যাওয়া। কুঁচকিতে ঘা নিয়েও ম্যাচ খেলে দলকে সাহায্য করা। কোচ পি কে ব্যানার্জি একবার ‘রাজা–রানির’ গল্প শুনিয়ে মনোরঞ্জনকে তাতিয়ে ম্যাচে নামিয়ে দিয়েছিলেন। রক্ষণে মনোরঞ্জন থাকা মানে সতীর্থদের কাজ অর্ধেক হয়ে যেত। নিজের কীর্তির প্রসঙ্গে কথা বলতে একেবারেই নাপসন্দ ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ডাকাবুকো ডিফেন্ডারের, ‘নিজের সম্বন্ধে কথা বলতে ভাল লাগে না। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমাদের সময়ে ইস্টবেঙ্গলের পরিবেশ আলাদা ছিল। অনেক খোলামেলা ছিল। খেলোয়াড়রা মন খুলে কথা বলত। মাঠে খেলত মনপ্রাণ দিয়ে। জান লড়িয়ে দিত।’
ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলার হিসেবে কমবেশি সব ট্রফিই জিতেছেন। পাশাপাশি কোচ হিসেবে ইস্টবেঙ্গলের প্রথম আই লিগ (‌তৎকালীন জাতীয় লিগ)‌ জিতিয়েছেন। ক্লাব বিপদে পড়লেই ডাক পড়েছে তঁার। এদিন সন্ধেয় বেলঘরিয়া স্টেশন লাগোয়া ফ্ল্যাটে নিজের ড্রয়িংরুমে বসে মনোরঞ্জন বলছিলেন, ‘আমি ইস্টবেঙ্গলে ঢুকেছিলাম বিশাল চাপ নিয়ে। অশোকলাল ব্যানার্জির জায়গায় আমাকে নেওয়া হয়েছিল। অশোকলাল ব্যানার্জি ইস্টবেঙ্গল রক্ষণের স্তম্ভ ছিলেন। ওর জায়গায় যখন আমাকে সই করানোর কথা বলা হল, প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ওঁর ভক্ত ছিলাম আমি। মাথায় বিশাল চাপ নিয়ে খেলা শুরু করেছিলাম। প্রথম দিন থেকে কঁাধে অনেক দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নামতাম।’
সেই মনোরঞ্জন চাপ সামলে উঠে সমর্থকদের মনে জায়গা করে নিলেন। ময়দানের গল্পে শোনা যায়, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা কোনও দিনও মনোরঞ্জনকে গালিগালাজ করেনি। শুধু সমর্থকরা কেন, সমসাময়িক সময়ে সতীর্থদের মধ্যে অলোক দাস, অলোক মুখার্জি, প্রয়াত সুদীপ চ্যাটার্জি, স্বরূপ দাস, বিকাশ পঁাজিদের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিলেন তঁাদেরই সতীর্থ মনোরঞ্জন।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top