অনির্বাণ মজুমদার: ২০০৬ সালের দোহা এশিয়ান গেমস। খলিফা ইন্টারন্যাশনাল টেনিস কমপ্লেক্সে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় একজনের চোখজোড়া চিকচিক করছে।‌ ‘জনগণমন’ মুখড়া থেকে যত অন্তরায় যাচ্ছে, চোখের জলও ততই ছন্দ পাচ্ছে, গলায় ঝুলতে থাকা সোনার পদকের সঙ্গে আলিঙ্গনও গভীরতর হচ্ছে। আর এগুলো সবই এক সুতোয় বেঁধেছে পার্টনারের স‌ঙ্গে বিখ্যাত সেই চেস্ট বাম্প, প্রতিটি পয়েন্টের পর গ্যালারি ফাটানো চিৎকার, যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রায় খাদের কিনারা থেকে ম্যাচ জেতার অদম্য অঙ্গীকার, জেতার পর তেরঙা নিয়ে স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ।
এ হেন ৪৬ বছরের লিয়েন্ডার পেজের এখন একটাই প্রতিপক্ষ— বয়স। নিজেকে টেনিস সার্কিটে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার করে সেই প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে এগিয়ে চলেছেন লি। পয়েন্ট নষ্ট করার পর যন্ত্রণার লাফ, ভলিতে পয়েন্ট জেতার পর উন্মাদোচিত সেলিব্রেশন— পঁয়তাল্লিশোর্ধ্ব লিয়েন্ডার মানে বয়স শুধুই একটা সংখ্যা, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক ধাঁধা, হেঁয়ালি, থেকে গেছে রহস্য। 
রহস্য যাতে উদ্ঘাটিত না হয়, তার জন্য লিয়েন্ডারের সর্বশেষ প্রচেষ্টা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ। পা জোড়া যাতে ২০ বছর আগের মতোই তরতাজা থাকে। আর বারবার বদলাতে হয়েছে সংসার। ১৯৯০ থেকে ২০১৯, এই ২৯ বছরে ডাবলসে লিয়েন্ডার খেলছেন ১২৯ জনের সঙ্গে জুটি বেঁধে। মিক্সড ডাবলসে ১৯৯৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এই সংখ্যাটা ২৫। অর্থাৎ সঙ্গী বা সঙ্গিনীর খেলার স্টাইল অনুযায়ী গত ২৯ বছরে ১৫৪ বার নিজেকে বদলে ফেলে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
এই চমকপ্রদ সত্যগুলোর পাশাপাশি পরিসংখ্যানের খাতায় এটাও লেখা থাকছে যে, ২০১৬ সালের পর একটিও গ্র‌্যান্ড স্লাম খেতাব নেই লিয়েন্ডারের। ২০১৭ সাল থেকে জেতা–‌হারার অনুপাত ২৮–‌৩৭। তবে কি এবার লিয়েন্ডারের বিদায় নেওয়া উচিত, এই প্রশ্নটা গত তিন বছরে ক্রমশ জোরালো হয়েছে। 
চল্লিশোর্ধ্ব যে কোনও খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেই ফর্ম যখন পড়তির দিকে থাকে, তখন তাঁর অবসর নিয়ে জল্পনাও ততই গাঢ় হতে শুরু করে। লিয়েন্ডারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কখন সরে দাঁড়ানো উচিত, এটা নিজের শরীর, মন যাচাই করে সেই খেলোয়াড়ই সবথেকে ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর লিয়েন্ডার পেজের মতো বর্ণময় খেলোয়াড়জীবন যাঁর, এই অধিকার তিনি অর্জন করে নিয়েছেন। তবু পারিপার্শ্বিক বিবেচনা করে লিয়েন্ডারের সরে যাওয়াই উচিত। পারিপার্শ্বিক বলতে কারণ একটাই— ভারতীয় টেনিসের দুর্দশা। এখনই লিয়েন্ডার পেজকে ভারতীয় টেনিসের দরকার, অন্যভাবে। হয়তো কয়েক বছর আগেই দরকার ছিল। না হলে রোহন বোপান্নার মতো একজনকে বছরের পর বছর ধরে যোগ্য ম্যাচ উইনারের জন্য অপেক্ষা করতে হত না। ভারতীয় টেনিসের তৃণমূলস্তরে এখনই লিয়েন্ডারের জাতীয়তাবোধ, অভিজ্ঞতা, খেলার প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালবাসা, আবেগের সঞ্চারণ প্রয়োজন। 
ক্রিকেট, ফুটবল, হকির মতো টিম গেমে কোনও মহাতারকার অবসরের দাবি তোলা অনেক সঙ্গত। কারণ, সেখানে পরবর্তী প্রজন্মকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার একটা দায়বদ্ধতা থাকে। টেনিস, ব্যাডমিন্টনের মতো ব্যক্তিগত খেলায় সেটা নেই। কিন্তু লিয়েন্ডারের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নটাও উঠছে। গত এক দশকে অলিম্পিকের জন্য ভারতীয় টেনিস দল নির্বাচন মানেই তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। তার সবক’‌টির কেন্দ্রে ছিলেন লিয়েন্ডার। ২০০৮ অলিম্পিকে মহেশ ভূপতির সঙ্গে লিয়েন্ডারের জুটি বাঁধা নিয়ে এই বিতর্কের শুরু। মহেশ জানিয়ে দেন, আর কখনও লিয়েন্ডারের সঙ্গে খেলবেন না। ২০১২ অলিম্পিকে মহেশ এবং বোপান্না দুজনেই লিয়েন্ডারের সঙ্গে খেলতে অস্বীকার করেন। এআইটিএ–‌কে বাধ্য হয়ে মিক্সড ডাবলসে সানিয়ার সঙ্গে জুড়ে দিতে হয় লিয়েন্ডারকে। তার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগেই মহেশের সঙ্গে জুটি বেঁধে ফ্রেঞ্চ ওপেন মিক্সড ডাবলস খেতাব জিতেছিলেন সানিয়া। ২০১৬ সালে বোপান্না জুটি হিসেবে লিয়েন্ডারের বদলে বেছে নেন সকেথ মাইনেনিকে। ফলে, গত তিনটি অলিম্পিকে ভারত টেনিসে সেরা দল নামাতেই পারেনি। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। 
বিদায় সবসময়ই দুঃখের। বিশেষ করে সেটা যখন কোনও মহাতারকার ক্ষেত্রে ঘটে। কিন্তু তবু সময় আসে যখন বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকাতে হয়। তাই ভারতীয় টেনিসের স্বার্থেই লিয়েন্ডার এবার আরও বেশি করে জড়ান এই খেলার সঙ্গে, কিন্তু একটু অন্যভাবে। ক্রীড়াপ্রশাসনে আসুক না বেহালার পর বেকবাগানের এক খেলাপাগল ব্যক্তিত্ব।‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top