সৌমিত্র কুমার রায়- একটা সময় ছিল, যখন তাঁরা লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় আসতেন। তারপর হাতখরচ তুলতে কলকাতায় খেপের ময়দানে নাম লেখাতেন। 
সময় বদলেছে। আফ্রিকান দেশগুলো থেকে বিদেশিরা খেপ খেলতেই কলকাতায় আসেন। অনেকে স্রেফ খেপের টানেই কলকাতায় থেকে গিয়েছেন। ইদানীংকালে ভিসা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। আগে অত কড়াকড়ি ছিল না। ছ’মাসের ভিসা নিয়ে এসে তাঁরা বছরের পর বছর থাকতেন। সম্প্রতি ধরপাকড় চলছে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ নাইজেরিয়ান, লাইবেরিয়ান ফুটবলারদের ধরার জন্য। কিন্তু খেপের মাঠে বিদেশি ফুটবলারদের রমরমা কমেনি। 
কলকাতা লিগে মোহনবাগানকে হারানোর নায়ক পিয়ারলেসের আনসুমানা ক্রোমা বলেছিলেন, ‘দেশে অসুস্থ মাকে টাকা পাঠাতে হয়। ওখানে পরিবার রয়েছে। তারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এত অর্থ জোগাড় করতে আমায় খেপ খেলতেই হয়।’ 
কলকাতা ময়দানে খেপ খেলা সব বিদেিশর মনের কথাটা বলে দিয়েছেন ক্রোমা। খেপের মাঠে তিনি বেশ জনপ্রিয়। তবে তঁার থেকেও জনপ্রিয় বিদেশি ওয়াইদি। তিনিই খেপের মাঠের ‘রাজা’। ৩২ বছরের ওয়াইদি লেখাপড়া করতে কলকাতায় এসেছিলেন। তারপর এই শহরেই থেকে গিয়েছেন। খেপ খেলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। খেপের মাঠে ওয়াইদি এবং ক্রোমা— এই দু’জনের দর সবচেয়ে বেশি। খেপের সঙ্গে যুক্ত এক কর্তার কথায়, ‘খেপ খেলে ওয়াইদি বছরে প্রায় লাখ ত্রিশ উপার্জন করে। ক্রোমা প্রায় কুিড় থেকে পঁচিশ লাখ। ক্লাব খেললে ওদের এত টাকা কে দেবে? তার ওপর খেপের মাঠে নগদে পেমেন্ট। ধার–বাকির কোনও গল্প নেই। সে কারণে ওরাও খেলতে আগ্রহী।’ 
ওয়াইদি নিজে বলছিলেন, ‘কলকাতায় খেপের বাজার খুব ভাল। পেটের দায়ে খেপ খেলি। বড় ক্লাবে খেলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কলকাতার বড় ক্লাবে খেলা অনিশ্চয়তায় ভরা। আজ ক্লাব আছে, কাল নেই। কিন্তু খেপের মাঠে চোট না থাকলে খেলার অভাব নেই।’
ওয়াইদি ভুল কিছু বলেননি। সারা বছরই প্রায় গোটা বাংলা জুড়ে নানা দিন–রাত্রি ব্যাপী টুর্নামেন্ট হয়ে থাকে। আগস্ট থেকে জানুয়ারি পাড়া ফুটবল প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি। বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুরের নানা জায়গায় সেই টুর্নামেন্ট হয়। শহর ও শহরতলির মধ্যে খেপের টুর্নােমন্ট হয় উল্টোডাঙা, বেলেঘাটা, খিদিরপুর, বেলঘরিয়া, বরানগর, বারাসত, বেহালা, মধ্যমগ্রাম, বালি–সহ নানা জায়গায়। খেপের জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট বলতে আর জি কর মাঠ, শ্যাম পার্ক, বিআরএস–ইলেভেন কোয়ার্টারের মাঠ, বেলেঘাটা কিশোর সংঘ, বেহালা অঙ্কুর, বারুইপুরের রাসের মাঠ, কসবা সমন্বয় সমিতির মাঠ, ঠাকুরপুকুরের পল্লীমঙ্গল মাঠ, বরানগরের প্রগতি সংঘ এবং বালির নবীন সংঘের প্রতিযোগিতা।   
খেপের প্রচলন কবে? 
নির্দিষ্ট সাল–তারিখ বলা মুশকিল। তবে খেপের সঙ্গে জড়িত কর্তারা জানাচ্ছেন, মোটামুটি সাতের দশক থেকে ময়দানে  খেপের প্রচলন। সময় যত এগিয়েছে, তত শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে খেপ। বর্তমানে কমবেশি ৪০–৫০ জন বিদেশি খেপ খেলেন। বছরে প্রায় ১০০টি মাঠে খেলা হয়। 
মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান বাদে কলকাতা লিগের সব ক্লাবের বিদেশিরাই খেপের সঙ্গে জড়িত। বড় ক্লাবে খেলার সঙ্গে খেপ খেলে বিতর্কে জড়িয়েছেন, এমন নজিরও রয়েছে। এখন ক্রোমা, ওয়াইদি ছাড়াও ইচে, কামো, রিচার্ড, জোসেফ, ডোডজ, কাজিম, ইউসুফ, ফ্রান্সিস, স্ট্যানলি, ওরোক ওরোক, আদিলেজা, জন, এডি, সানডে, থিও, মোজেস, ফিলিপ আজা–সহ অনেকেই খেপ খেলেন। ভারতীয় ফুটবলে দাপিয়ে খেলা ওডাফা ওকোলির উত্থান খেপের মাঠ থেকেই। 
টুর্নামেন্টের ‘গ্ল্যামার’ অনুযায়ী খেপের বিদেশির দর নির্ধারিত হয়ে থাকে। সাধারণত বড় টুর্নামেন্টে ওয়াইদির দর প্রতি ম্যাচে ২৫ হাজার। তিনিই ‘হায়েস্ট পেইড’ বিদেশি। কোনও কোনও জায়গায় প্রতি ম্যাচে ১৫–২০ হাজারেও খেলেন। ক্রোমার দর প্রতি ম্যাচে ২০ হাজার। কখনও প্রতি ম্যাচ ১২–১৪ হাজারেও রাজি হন তিনি। বাকি বিদেশিরা প্রতি ম্যাচে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজারে খেলেন। একই দিন কোনও বিদেশির দু–তিনটি টুর্নামেন্টে একসঙ্গে খেলা পড়ে গেলে তঁাকে যে কোনও একটা টুর্নামেন্টের জন্য রাজি করাতে চুক্তিমতো নগদ ছাড়াও ‘ইনসেন্টিভ’ দেওয়া হয়। পেট চালাতে খেপ খেললেও চোট লেগে সারা জীবনের মতো ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঝুঁকিও থেকে যায়। তবু জীবনসংগ্রামের অঙ্গ হিসেবেই কলকাতা ময়দানে বিদেশিদের খেপ খেলার আকুতি। দিনের শেষে খেপ থেকে অর্জিত অর্থেই পরিবারের মুখে হাসি ফোটান তাঁরা।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top