বিশ্বজিৎ দাস: গত ৭২ ঘণ্টায় পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। যদিও তার জীবন এতটুকুও বদলায়নি। বরং বিশ্বকাপ পর্বের লড়াই, বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, ঈশান পোড়েলকে যেন আরও পরিণত করে তুলেছে। আর দ্রাবিড়ীয় পাঠশালা শিখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে সব কিছু থেকে ইতিবাচক জিনিসগুলো নিয়ে জীবনে এগিেয় যেতে হয়।
মঙ্গলবার সকালে কলকাতা বিমানবন্দর চত্বরে থিকথিকে ভিড়। সিংহভাগটাই ছিল ঈশানের পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের। ব্যতিক্রম সিএবি–র তিন কর্তা এবং ইস্টবেঙ্গল ক্রিকেট অধিনায়ক অর্ণব নন্দী–সহ ক্লাবের কয়েকজন আধিকারিক। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যে বদলেছে সেটা টের পাচ্ছে ঈশানও। তাই তো প্রসঙ্গ উঠতেই বলে দিল, ‘এখন লোকজন চিনতে পারছে। অ্যাটেনশন িদচ্ছে। শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, কথা বলতে আসছে। সেলফি তোলার আবদার করছে। তাতে আমার জীবনে কোনও বদল আসেনি। বরং এটার ভাল জিনিস হচ্ছে, এরপর যখনই ম্যাচ খেলতে নামব, সেখানে সবার নজর আমার ওপর থাকবে। সেখানে পারফর্ম করতে পারলে এগিয়ে যাওয়ার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।’ 
মুম্বইয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বসে রাহুল দ্রাবিড় পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, ওদের আসল পরীক্ষা এবার শুরু। বিশ্বকাপ জয়ের পর পৃথ্বীদের সতর্ক করে বলেও দিয়েছিলেন, ২০১২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের মাত্র একজন ভারতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে। সতর্কবার্তার মতোই এই পরামর্শ মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছে ঈশান। প্রসঙ্গ উঠতেই বলে দিল, ‘দুম করে সিনিয়র টিমে ডাক পেয়ে যাব, এমন কোনও রিমোট কন্ট্রোল নেই। এটার জন্য অনেক ধাপ পেরোতে হবে। তার আগে রনজিতে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে হবে। বিজয় হাজারে, মুস্তাক আলি টুর্নামেন্ট রয়েছে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিয়া ‘এ’ টিম। এখন সেটাকে টার্গেট করে এগোতে চাই। পারফর্ম করতে চাই।’ আরও দুটো জিনিস বলেছিলেন দ্রাবিড়— ফাইনালে এই দলটা নিজেদের সেরা ম্যাচ খেলেনি। এবং ওরা আমার সব কথা শুনত এমনটা নয়। এই বয়সে কিছু দুষ্টুমিও করত, যেগুলো েমনে নিতে হয়। দ্রাবিড়ীয় উবাচের সঙ্গে সহমত ঈশানও। একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছে, ‘কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনালে যে ব্র্যান্ড অফ ক্রিকেট খেলেছিলাম, ফাইনালে আমরা সেটা পারিনি। আসলে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের কিছুটা চাপ তো থাকেই। আর দুষ্টুমির বিষয়টা হচ্ছে (হাসতে হাসতে)— আমরা সব কিছুই শুনতাম। তবে কিছু কিছু জিনিস ছিল, যেমন হোটেলে ঢোকার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখলে আমরা আগেই মেসেজ করে দিতাম, হোটেলে ঢুকে পড়েছি।’
চলার পথে মুখ থুবড়ে পড়লে তবেই ঈশান পোড়েল ঘুরে দাঁড়ায়। তার ক্রিকেট সফরের সঙ্গে জড়িতদের অভিমত এমনটাই। স্বীকার করে নিয়েছে ঈশানও। কথা উঠতেই বলে দিল, ‘পিছিয়ে পড়ার ধাক্কাটাই আমাকে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ফিরে এত জোরে চিৎকার করেছিলাম, যে সবাই বলেছিল কিছু হয়নি। তারপর আদিত্য ঠাকরে দলে আসছে শোনায় আরও জেদ চেপে গিয়েছিল।’ পরক্ষণেই যোগ করে, ‘গতবার রাজস্থান ম্যাচে আমার রনজি অভিষেক হয়ে যেত। কিন্তু পেশির চোটে ফিরে আসতে হয়। সেই যন্ত্রণার দিনগুলোই আমাকে আরও বেশি করে মোটিভেট করে যায়। এ বছর সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল রনজিতে ডাক না পাওয়া। অবশ্যই বিষয়টা নির্বাচকদের। কিন্তু এই ধাক্কাগুলোই আমার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল।’
বিশ্বকাপ জয়ের দিন হোটেলে ফেরার সময় টিম বাসে তার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। বিদায়বেলায় কী বলেছিলেন হেডস্যর? ঈশানের জবাব, ‘শুধু বলেছেন, প্রসপেক্ট ভাল। তুমি হার্ড ওয়ার্কার। সব ঠিক আছে। কিন্তু ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য তোমার ডায়েটে আরও জোর দিতে হবে। সেটা ঠিক করতে হবে। ফিটনেসের জন্যই এনসিএ যাব। সেখানেই ডায়েটের ব্যপারাটা ঠিক করে নেওয়ার ওপর জোর দেব। কারণ এটা ঠিক করতে না পারলে এগিয়ে যাওয়া মুশকিল।’ 
কলকাতায় পা রাখার পর থেকেই শুভেচ্ছার ঢলে ভাসছেন। আপ্লুত ঈশানের কথায়, ‘যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী, ক্রীড়ামন্ত্রী, ইন্দ্রনীল স্যর (‌সেন) শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, দারুণ লাগছে। আলাদা অনুভূতি।’ মুখ্যমন্ত্রী বিমানবন্দরে উত্তরীয়ও পাঠিয়েছেন ঈশানের জন্য। চোটের জন্য বিজয় হাজারে ট্রফির গ্রুপ লিগে তার খেলা হবে না। খোদ রাহুল দ্রাবিড় বিষয়টা নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে কথা বলেছেন, বলেও জানা গেছে। তবে বেঙ্গালুরুর জাতীয় ক্রিকেট আকাদেমিতে রি–হ্যাবে যাওয়ার আগে দিন সাতেক ছুটির মেজাজে থাকতে চায়। যেখানে বাড়িতে মায়ের হাতের রান্না আর আইসক্রিমে সময় কাটানোর ইচ্ছে রয়েছে।
ঈশানকে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে নিতে চন্দননগর জুড়ে সাজ সাজ রব। যদিও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এদিন সল্টলেকের এক গেস্ট হাউসেই ছিল সে। আজ সকালে ভদ্রেশ্বর থেকে হুডখোলা গাড়িতে চাপিয়ে বিশ্বকাপের নায়ককে এলাকা পরিক্রমা করানোর পরিকল্পনা রয়েছে আয়োজকদের। ‘ছোটবেলায় বাড়ির সবাই চেয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার হই।’— কথা প্রসঙ্গে বলছিল ঈশান। তবে সন্তানের ইঞ্জিনিয়ার হতে না পারার আক্ষেপ নিশ্চয়ই এতদিনে মিটে গেছে পরিবারের।‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top