বিশ্বজিৎ দাস: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭— চন্দননগরের সম্বলা শিবতলা এলাকার রথের সরকের বাড়ি থেকে শেষবার বেরিয়েছিল কিট ব্যাগ কাঁধে। সঙ্গী ছিল একঝাঁক স্বপ্ন। সেদিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু–বান্ধব ও কয়েকজন প্রতিবেশী ছাড়া কেউই সেভাবে খেয়াল করেনি তাকে। অথচ সময় কত সহজেই সবকিছু বদলে দেয়।
গত দু’দিন ধরেই প্রস্তুতি চলছিল। সাজো সাজো রব পুরো চন্দননগর জুড়ে। বিশেষ করে সম্বলা শিবতলা এলাকায়। হোক না ঘরের ছেলে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য বলে কথা! বড় বড় ফ্লেক্স ব্যানার, হোর্ডিংয়ে ছেয়ে গিয়েছে জগদ্ধাত্রী পুজোর শহর। বুধবার সকালে কলকাতা থেকে আসা ঈশান পোড়েলের কনভয় তেলিনী পাড়ায় ভদ্রেশ্বর পৌরসভা দপ্তরের সামনে থামতেই তৎপরতা যেন মুহূর্তে কয়েকগুন বেড়ে গেল। মিনিট পনেরোর বিরতির সুযোগে সাত–সকালেই তাকে ছোট সংবর্ধনা দিয়ে ফেললো ভদ্রেশ্বর পৌরসভা। ততক্ষণে রকমারি ফুলে সুসজ্জিত হুডখোলা জিপ হাজির। সামনে কয়েকশো বাইকে তেরঙা উড়ছে। বাবা–মা’কে নিয়ে ঈশান যখন সেই শোভাযাত্রার গাড়িতে উঠল, তার জয়ধ্বনীতে এলাকা গমগম করছে।
চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর শোভাযাত্রার খ্যাতি গোটা বঙ্গ জুড়েই।

সেই পথেই ঈশানের শোভাযাত্রা পরিক্রমার রুট ম্যাপ চূড়ান্ত করেছিল প্রশাসন। আনুমানিক সময় ধার্য করা হয়েছিল দেড় ঘন্টা। অথচ বুধবার সকালে ঈশানের শোভাযাত্রা সেই পথ পরিক্রমা করতে পাক্কা আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে ফেললো। সবচেয়ে বেশি সময় খরচ হল ঈশানের পাড়া সম্বলা শিবতলা এলাকার রথের সরকে। লাল কার্পেটে চ্যাম্পিয়নের পুরো পাড়া মুড়ে ফেলা হয়েছে। দু’ধারে পুষ্প বৃষ্টিতে ঘরের ছেলেকে স্বাগত জানাতে তৈরি প্রতিবেশীরা। সেই সঙ্গে তাকে নিয়ে জয়ধ্বনী তো রয়েছে। শোভাযাত্রার গাড়ি পাড়ায় ঢুকতেই চকিতে চোখে জল ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা ছেলেটার। সেই হুডখোলা জিপের সামনের আসনে বসে থাকা ছেলের মা–ও ততক্ষণে শাড়ির  আঁচলে চোখ মুছছেন। পরে সে প্রসঙ্গ উঠতে লাজুক মুখে ঈশানও বলে ফেলে, ‘আসলে কোনওদিন আমাকে নিয়ে পাড়ায় এরকম কিছু হবে কল্পনাও করিনি। তাই আমাকে নিয়ে এরকম আয়োজন দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম।’ পাড়াতেই ঈশানের হাত দিয়ে তেরঙ্গা বেলুন ও পায়রা ওড়ানো হল। 
ফরাসি সাম্রাজ্যের অনেক চিহ্ন রয়েছে চন্দননগর জুড়ে। বিশেষ করে চন্দননগর স্ট্যান্ড সংলগ্ন জোড়াঘাট এলাকায়। গঙ্গার গা ঘেষা এই অঞ্চলে একসময় ফরাসিদের আনাগোনা ছিল নিয়মিতভাবে।

সেখানেই ঈশানকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেছিল চন্দননগর স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন ও চন্দননগর পৌরসভা। তার আরও একটা বড় কারন, পাশেই অরবিন্দ িবদ্যামন্দির। যে স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল ঈশান। স্কুলের কৃতী প্রাক্তনীকে দেখতে সকাল থেকেই সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল ছাত্ররা। পৃথ্বী শ–র দলের তারকা পেসারকে চাক্ষুস করতে পিছিয়ে ছিলেন না চন্দননগর কলেজের ছাত্র–ছাত্রীরাও। ঈশানকে নিয়ে শোভাযাত্রা যখন সেখানে পৌছল, এলাকা জুড়ে থিকথিকে ভিড়। শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মঞ্চে ওঠার অপেক্ষা। যেখানে হাজির ছিলেন মন্ত্রী লক্ষ্মীরতন শুক্লা, চন্দননগরের মেয়র এবং ঈশানের স্কুল অরবিন্দ বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষিকা। আয়োজকদের পাশাপাশি স্কুল, স্থানীয় ক্লাব এবং বিভিন্ন সংস্থার তরফেও সংবর্ধিত করা হয় ঈশানকে। তুলে দেওয়া হয় স্মারক, মানপত্র, মিষ্টি। স্কুলের খুদেদের দেখে স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণও উঠে এল ঈশানের মুখে। স্কুল বাঙ্ক দেওয়া, এবং ধরা পড়ে শাস্তি। সেসব কাহিনী শুনে ছাত্রদের সঙ্গে হেসে ফেললেন শিক্ষিকারাও।
শুধু এলাকা নয়, লক্ষ্মীর হাতে একটি পাগড়ি পাঠিয়েছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।

যেটা ঈশানকে পরিয়ে দিলেন খোদ লক্ষ্মী। আর বাংলার প্রাক্তন রনজি অধিনায়ক তথা বর্তমান মন্ত্রীমশাই নিজের শততম রনজি ম্যাচে স্মারক সিএবি থেকে পাওয়া ১০০ লেখা জার্সিটাই তুলে দিলেন উত্তরসূরির হাতে। সঙ্গে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলে গেলেন, ‘চাই ঈশান আমার মতো ১০০ রনজি ম্যাচ খেলুক। আরও এগিয়ে যাক। চন্দননগর থেকে আরও অনেক ঈশান উঠে আসুক।’ লক্ষ্মীর থেকে এমন সম্মান পেয়ে আপ্লুত ঈশান পরে বলেই ফেলে, ‘আমার পাওয়া স্মরণীয় উপহারের একটা। বিশ্বকাপ মেডেল ও ট্রফির সঙ্গেই লক্ষ্মীদা–র দেওয়া টি–শার্টটা সাজিয় রাখব।’ শুধু ঈশান নয়, মঞ্চ উজ্জ্বল করে সংবর্ধিত করা হল তার মা–বাবাকেও। স্মারক তুলে দেওয়া হল তার দুই কোচ বিভাস দাস ও প্রদীপ মন্ডলের হাতেও। বিকেলে তার ক্লাব ন্যাশনাল স্পোর্টিং ও পুলিস লাইনের তরফের সংবর্ধিত করা হয় বিশ্বকাপের নায়ককে।
বিগত ৪২ দিনে নানান চড়াই–উতরাইয়ের সাক্ষী থাকতে হয়েছে তাকে। অবশেষে বাড়ি ফেরার স্বস্তি। আপাতত চাহিদা, নিজের চেনা বিছানায় শান্তির ঘুম। সংবর্ধনার পর্ব মিটিয়ে সন্ধ্যেয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক আর হুল্লোড়ে যেন পুরনো জীবনে ফিরে যাওয়া।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮— যেন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল ঈশান পোড়েলের।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top