দেবাশিস দত্ত: ২১২ রানের জবাবে ২০৮।
প্রায় তীরে এসে তরী ডোবার গল্প আর কী‌!‌
তবে, মোদ্দা কথাটা হল, ভারত পারল না। সিরিজ হারতে হল ১–‌২ ব্যবধানে। জেতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেও হার স্বীকার করতে হল। শেষ ২ বলে বাকি ছিল ১৩ রান। তখনই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। শেষ বলে দীনেশ কার্তিক ওভার বাউন্ডারি মারলেন বটে সাউদিকে, তাতে দলের রান সংখ্যা বৃদ্ধি হল বটে, ফলাফলে কোনও হেরফের ঘটল না। ভারত হারল ৪ রানে। অস্ট্রেলিয়ায় চমকপ্রদ টেস্ট সিরিজ জয়ের পর নিউজিল্যান্ডে উড়ে গিয়ে একদিনের সিরিজ জেতার পর, মার্টিন ক্রো–‌র দেশে প্রথম টি–‌টোয়েন্টি ম্যাচ জেতার কারণে আনন্দে টগবগ করে ফুটতে থাকা রোহিত শর্মার ভারত, দেশে ফিরে আসার শেষ পর্বে হঠাৎই এই পরাজয়ে গেল চুপসে। শেষ পাতে দইয়ের বদলে পরিবেশন করা হল করলার ঝোলের!‌
ভাল খেলেও পরাজয়ের আরও একটি উদাহরণ। স্কোরের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে, ভারত কিন্তু লড়াই চালিয়ে গেছে শেষ বল পর্যন্ত। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। হ্যামিলটনের ছোট আকৃতির মাঠে দু’‌দলের ব্যাটসম্যানরাই চার–‌ছয় মেরেছেন প্রচুর। তবু, ৪ রানের ব্যবধান!‌ আলগা ফিল্ডিং, গোটা তিনেক সহজ ক্যাচ গলানো সত্ত্বেও রোহিতরা জয়ের চৌকাঠের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে যিনি গত মরশুমে শ্রীলঙ্কায় নিধাহাস ট্রফি জেতানোর নায়ক দীনেশ কার্তিক ছিলেন ক্রিজে। ৪ বলে ১৪, এই পরিস্থিতিতে দীনেশ একটি খুচরো রান নিতে‌ ‌পারতেন সহজেই, নন স্ট্রাইকিং প্রান্তে থাকা ক্রুনাল পান্ডিয়া রান নেওয়ার জন্য এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু দীনেশ তাঁকে ফিরিয়ে দেন এ কথা বলে যে, পরবর্তী ৩ বলে তিনি জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি রান তুলে ফেলবেন। দিনটা দীনেশের ছিল না। ১৮ নম্বর ওভারে যিনি ১৮ রান দিয়ে ভারতকে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেই সাউদি কোনওরকমে ১২ রান দিয়ে ভারতকে পরাজয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন। সরস্বতী পুজোর দিনে ভারতকে সত্যিই ফিরতে হল খালি হাতে। এদিন ৪০ বলে ৭২ রান করার জন্য ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পেলেন কলিন মুনরো। আর তিন ম্যাচেই ব্যাট হাতে অনবদ্য ধারাবাহিকতা দেখিয়ে চিহ্নিত হলেন সিরিজের সেরা ক্রিকেটার!‌ ভারতের মতো ওজনদার দলকে হারিয়ে নিউজিল্যান্ড এই মওকায় পেয়ে গেলে এক ব্যাগ আত্মবিশ্বাস, যা কিনা, আগামী দিনে কেন উইলিয়ামসনদের বাড়তি উদ্দীপনা নিয়ে লড়াই করার শক্তি জুগিয়ে গেল।
এদিন শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ড দ্রুতগতিতে রান তোলার দিকে নজর দিয়েছিল। খেলা শুরুর আগে থেকেই ভারতীয় শিবির চাইছিল, সেইফার্ট–মুনরো জুটি ভাঙার। কিন্তু ভুবনেশ্বর কুমার–খলিল আহমেদরা কিউয়ি শিবিরের প্রথম উইকেটের জুটিকে অবদমিত করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে চাহালের পরিবর্তে সুযোগ পাওয়া কুলদীপ যাদবকে আক্রমণে আনতে হয়েছিল রোহিতকে। কুলদীপ এলেন, শলাপরামর্শ করলেন ধোনির সঙ্গে। এবং সেইফার্ট স্টাম্পড হয়ে গেলেন কুলদীপের বলে। একতরফা খেলা চলছিল তার আগে পর্যন্ত। কুলদীপ আক্রমণে আসতেই অস্বস্তির প্রহর শুরু হয়েছিল। সেইফার্টের তাণ্ডব (‌২৫ বলে ৪৩)‌ থামানোর পর, কুলদীপ তুলে নিয়েছিলেন কলিন মুনরোকেও। অফস্টাম্পের বাইরের বল পুল মারতে গিয়ে মুনরো ধরা পড়লেন হার্দিক পান্ডিয়ার হাতে। অবশেষে। তার কারণ, মাঝে হার্দিকের বলে ক্যাচ ফেলতেই তিনি মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়েই দু’‌হাত দিয়ে কপাল চাপড়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করেছিলেন।
দুটি দামি উইকেট কুলদীপ তুলে নেওয়ার পরই ভারত ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেছিল। কুলদীপকে ভয় পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া, এমনকী নিউজিল্যান্ডও। কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে উনিশ। আর কুলদীপ আক্রমণে এলেই উইকেট। কুলদীপকে দেখলেই মন–বালবের ফিউজ যাচ্ছে উড়ে। এদিন যেমন গেল দুই আক্রমণাত্মক ওপেনিং ব্যাটসম্যানের। এই দু’‌জন আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানের ব্যাটেই নিউজিল্যান্ডের ইনিংস ডানা মেলল। কোনও দেখনদারি ছাড়াই। ওঁরা জানতেন, ভারতকে চাপে ফেলার জন্য দু‌শোর বেশি রান জরুরি। তাই, শুরু থেকেই বেহালা ছেড়ে বারোতালের গিটার যেন হাতে তুলে নিয়েছিলেন সেইফার্ট, মুনরোরা। কুলদীপের ডেলিভারিতে যে গোলকধাঁধায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন, তা যেমন উল্লেখ করতে হবে, তেমনই এটাও বলতে হবে, ভারতের অন্য বোলাররা সেভাবে সমস্যা তৈরি করতে পারেননি।
শুরুতে শিখর ধাওয়ান (‌৫)‌ ফিরে যাওয়ার পর রোহিত শর্মা–বিজয় শঙ্কর জুটি ৭৫ রান যোগ করল। ওভার পিছু ১০ রান জমা হচ্ছিল বোর্ডে। ঋষভ পন্থ (‌১২ বলে ২৮)‌, হার্দিক পান্ডিয়া (‌১১ বলে ২১)‌ তুললেন দ্রুতগতিতে। একদা ১৭ ওভারে ৬ উইকেটে ১৬৫ রান পর্যন্ত তুলে ফেলেছিল ভারত। তবু, শেষরক্ষা হল না। বাঁহাতি স্যান্টনারকে দিয়ে ইনিংসের প্রথম ওভার করিয়ে শিখরকে চটজলদি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে ছিল চমক। তবু ইনিংসের যাত্রাপথ ছিল মসৃণ। টোল খেল শেষ মুহূর্তে। তখনই হড়কে গেল ভারত। দেশে ফেরার আগে এমন ছন্দপতনে, অল্প হলেও, রোহিতদের শিবিরে উড়ে এল বিষণ্ণতার কালো মেঘ।‌‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top