দেবাশিস দত্ত- চঁাদু বোরদে, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, কৃপাল সিং, দিলীপ বেঙ্গসরকার, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত–‌সহ প্রাক্তন নির্বাচক সমিতির চেয়ারম্যানদের সঙ্গে এখনকার এমএসকে প্রসাদের মিল কোথায়?‌ এঁরা সবাই যে কোনও বিদেশ সফরে দল নির্বাচনের পর বলে এসেছেন, ‘‌এটাই সেরা দল। সবচেয়ে ব্যালান্সড।’‌ ২০১৯ বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পর এখনকার চেয়ারম্যানও বলে দিলেন একই কথা। বলতে হয়। এই সময়কার বক্তব্য নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখে দিতে পারেন। (‌‌বালাই ষাট)‌ যদি বিশ্বকাপে, কোনও কারণে দল খারাপ খেলে, তখন এমএসকে–‌র এই মন্তব্যগুলি হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় আছেন নাকি?‌ তাহলে তো তখন পোয়াবারো হবে আপনার।
এবার দেখে নেওয়া যাক, সোমবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে কেমন দল গঠন করা হল।
ঘোষিত দল:‌ বিরাট কোহলি (‌অধিনায়ক)‌, রোহিত শর্মা (‌সহঅধিনায়ক)‌, কে এল রাহুল, কেদার যাদব, শিখর ধাওয়ান, বিজয় শঙ্কর, মহেন্দ্র সিং ধোনি, দীনেশ কার্তিক, যুজবেন্দ্র চাহাল, কুলদীপ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার, যশপ্রীত বুমরা, হার্দিক পান্ডিয়া, রবীন্দ্র জাদেজা এবং মহম্মদ সামি।
১৫ জনের এই তালিকায় মন দিয়ে নজর দিলে, ৩ জন উইকেটরক্ষকের নাম খুঁজে পাবেন। ধোনি ছাড়াও সুযোগ পেয়েছেন দীনেশ কার্তিক। এবং কে এল রাহুল। শিখর বা রোহিতের পার্টনারশিপ ভেঙে রাহুলকে খেলানো হবে তখনই, যখন এই দুই প্রতিষ্ঠিত ওপেনার টানা অন্তত তিন ম্যাচে ব্যর্থ হবেন। এমনও হতে পারে, ৮৩–‌র বিশ্বকাপে সুনীল ভালসনের মতো একটাও ম্যাচে সুযোগ না–‌ও পেতে পারেন কে এল। ভারতীয় দল পরিচালন সমিতি কে এল–‌কে অবশ্য সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন মিডল অর্ডারে। যদি কেদার যাদব, বিজয় শঙ্কর, দীনেশ কার্তিকরা ব্যর্থ হন, তখন কে এল–‌এর সুযোগ আসলেও আসতে পারে। তখন অবশ্য বলা হবে, ওপেনার থেকে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন কে এল!‌
জোরে বোলিং বিভাগে কোনও চমক নেই। থাকার কথাও নয়। বুমরা, সামি, ভুবনেশ্বর— এই তিন মূর্তিকে রাখা হয়েছে ১৫ জনের দলে। চতুর্থ এবং পঞ্চম জোরে বোলার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারেন যথাক্রমে বিজয় শঙ্কর ও হার্দিক পান্ডিয়া। বিজয় শঙ্কর সম্পর্কে দল নির্বাচনী সভার পর চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘‌অম্বাতি রায়ডুকে আমরা সুযোগ দিয়েছিলাম বেশ কয়েকটি ম্যাচে। অবশেষে সুযোগ দেওয়া হল দীনেশ কার্তিককে। আর বিজয় শঙ্কর এসেছে দলে তঁার তিন ধরনের ভূমিকা থাকার কারণে। আকাশ যদি মেঘলা থাকে, তখন বিজয় শঙ্কর স্যুইং বোলিং করতে পারবে। খুব ভাল ফিল্ডার। এবং চমৎকার ব্যাটসম্যান।’‌ থ্রি–‌ডি সিনেমার মতো বিজয় শঙ্করের এই তিন ভূমিকার তুলনা করলেন এমএসকে প্রসাদ। কেউ জানতে চায়নি, আকাশ মেঘলা না থাকলে, বিজয় শঙ্করকে কি বোলার হিসেবে ব্যবহার করা হবে?‌ এবারের আইপিএল–‌এ তঁাকে কিন্তু বোলিং করতে দেখা যাচ্ছে না।
অপেক্ষার পালা শেষ। বিশ্বকাপের দল নির্বাচন অবশেষে হয়ে গেল। এবং জায়গা পেলেন না ঋষভ পন্থ। প্রতিভা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। দীনেশ কার্তিকের সঙ্গে ঋষভের তফাত হল অভিজ্ঞতার অভাব। আমার ধারণা, নিধাহাস ট্রফির ফাইনালে জেতানোর পুরস্কার পেয়েই যাচ্ছেন দীনেশ। কত বয়স হল?‌ এ প্রশ্ন আমরা তুলছি না। কারণ, দীনেশকে এ ব্যাপারে লড়তে হবে চল্লিশ ছুঁইছুঁই মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে। এমনও হতে পারে, একটিও ম্যাচ না খেলে দীনেশকে ফিরে আসতে হতে পারে। নাকি তঁাকেও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবেন শাস্ত্রী–‌কোহলিরা?‌ ইংল্যান্ডে ভাল খেলে আসা ঋষভকে তাই আপাতত অপেক্ষা করতে হবে। সভায় অনেকটা সময় খরচ করা হয়েছে ঋষভকে দলে রাখার প্রসঙ্গ নিয়ে। কিন্তু, এমএসকে প্রসাদ যেভাবে ঘুঁটি সাজিয়ে সভায় ঢুকেছিলেন, তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, চেয়ারম্যানের সঙ্গে আরও দুজন নির্বাচক হাত তোলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন কার্তিকের অনুকূলে। উত্তরের নির্বাচক শরণদীপকে তাই আশাহত হতে হল। এমএসকে প্রসাদ পরে ঋষভের বাদ পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করলেন। বলেছেন, ‘‌হ্যাঁ, সভায় ঋষভকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। মাহি যদি চোট পায় তা হলে ঋষভ না কার্তিক কাকে নেওয়া হবে?‌ এই নিয়ে চর্চা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ যেমন কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনালে যদি এমনটা ঘটে, তবে কে সামলাবে?‌ প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমরা কার্তিককে বেছেছি। না হলে, ঋষভ দলে ঢুকে পড়ত। একটুর জন্য ও জায়গাটা মিস করল। কোনও সন্দেহই নেই ঋষভ অত্যন্ত প্রতিভাবান প্লেয়ার।’‌
গত দেড়–‌দু মাস ধরে বিরাট কোহলি বলে আসছিলেন যে, একটি জায়গার জন্যই দল আটকে আছে। দেখা গেল, তিনি ভুল বলেননি। অধিকাংশ সমালোচক আটকেও ছিলেন ওই একটি জায়গায়। ঋষভ পন্থ সুযোগ পাবেন কিনা?‌ পেলেন না। তাই, তৃতীয় স্পিনার হিসেবে লন্ডনগামী বিমানে বোর্ডিং কার্ড পেয়ে গেলেন রবীন্দ্র জাদেজা। (‌কেদার যাদবও থাকবেন)‌। তিনজন স্পিনার, তিনজন জোরে বোলার এবং হার্দিকের মতো অলরাউন্ডার। সব মিলিয়ে স্বীকৃত বোলারের সংখ্যা সাত। বিরাট প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন বিজয় শঙ্কর, রোহিত শর্মা এবং কেদার যাদবকে। তাই, চাপে পড়ে গেলে বিরাট কিন্তু বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র‌্য এবং পরিবর্তন আনতে পারবেন পরিস্থিতি অনুযায়ী। এছাড়া খলিল আহমেদ এবং নভদীপ সাইনিকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যা খবর, তাতে, এই দুজন জোরে বোলারকে নেটে বোলিং করার জন্য ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, সম্পূর্ণ বোর্ডের খরচে। খরচ পড়বে ২.‌৬০ কোটি টাকা। ভারতীয় বোর্ডের কাছে এটা কোনও অঙ্কই নয়। প্রথম সারির বোলারদের তাজা রাখার কারণে এই জোরে বোলারদের নেটে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। আলোচনা অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
২ বছর আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারার পর থেকেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন এখনকার নির্বাচকরা। ৪ নম্বর জায়গায় ব্যাট করবেন কে?‌ এ প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়। বিজয় শঙ্করের সঙ্গে সমানতালে আলোচনায় ছিলেন শ্রেয়াস আইয়ার, অম্বাতি রায়ডুরা। দল পরিচালনা সমিতি বিজয় শঙ্করের বাক্সে ভোট দিতেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। চেয়ারম্যান বলে দিয়েছেন, ‘‌সেরা দল নিয়ে ভারত যাচ্ছে এবার বিশ্বকাপে।’‌ আমরা তা মেনে নিচ্ছি। তবে, দলে কিন্তু বেশি বয়সের ক্রিকেটার রয়েছেন অনেকেই। ৫২ দিন ধরে সবাই ওই ধকল নিতে পারবেন তো?‌ নামগুলো না–‌ই বা বললাম।
প্রস্তুতিতে কোনও ফঁাক ছিল না, এ কথা কেউই বলতে চাইবেন না। এখন শুধু ভাল খেলার প্রশ্ন। যোগ্যতায় খামতি নেই। ভারসাম্য যথেষ্ট। এই দল যদি বিশ্বকাপ জিততে না পারে, তাহলে অনেকেই অবাক হবেন। এটুকু জানি, হেরে গেলে, ভারতীয় শিবিরের মধ্যে একমাত্র অধিনায়ক বিরাট কোহলি অজুহাতের রাস্তায় হঁাটবেন না। কারণ, তিনি জানেন, ভাল খেলার জন্য যা যা তিনি চেয়েছিলেন, তা তিনি সব পেয়েছেন ভারতীয় বোর্ডের কাছ থেকে। এটা জানেন বলেই অধিনায়ক নিজে আরও বেশি উদ্দীপ্ত হয়ে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করবেন। ১৩০ কোটির ভারতবাসীর শুভেচ্ছা যে তঁার দলের সঙ্গে থাকবে, এটা অধিনায়কও জানেন ভালই।‌‌‌‌

দল নির্বাচন শেষ। বিসিসিআই দপ্তর থেকে বেরিয়ে আসছেন বিরাট কোহলি। ছবি:‌ এএফপি
 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top