সমরেশ চৌধুরি: দীর্ঘদিন আই লিগ ঘরে আসেনি। কখনও রানার্স, কখনও তৃতীয় স্থানে শেষ করতে হয়েছে। লিগ টেবিলে পরের দিকেও জায়গা হয়েছে। এ বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। না, সাম্প্রতিককালে ইস্টবেঙ্গলের সামনে এইরকম সুযোগ আসেনি। সদস্য–সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর এটাই সেরা সুযোগ ফুটবলারদের সামনে। সত্যি কথা বলতে কী, অন্য দলগুলোর খেলা দেখেছি। ইস্টবেঙ্গলের খেলাও দেখেছি। ফুটবলারদের দেখে মনে হয়েছে, এটা দায়িত্ব নিতে জানে না, শুধু টাকা নিতে জানে। টাকা কখন পাব, সেই আসায় বসে থাকে। দল হারলেও এদের কোনও তাপ–উত্তাপ দেখা যায় না। পরের দিন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ঠিক টাকা নিতে চলে আসে। সমর্থকদের আবেগের কোনও মূল্য এদের কাছে আছে বলে মনে হয় না।
একটা কথা মিলিয়ে নেবেন, দলকে যদি চ্যাম্পিয়ন করতে নাও পারে, টাকা কবে পাব, সেটা নিয়েই চিন্তাভাবনা করবে। ফুটবলাররা যদি ১০০ শতাংশ দেয়, তাহলেই কিন্তু এ বছর আই লিগ লালহলুদ তাঁবুতে ঢুকবে। আমার মনে হয়, কোচের থেকেও ফুটবলাদের দায়িত্ববোধ বেশি থাকা উচিত। কোচ তো আর মাঠে নেমে খেলবে না। সিনিয়রদের পাশাপাশি জুনিয়রদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। জুনিয়রদের উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব সিনিয়রদের। আমার একটা ম্যাচের কথা মনে পড়ছে। ১৯৭০–এ পাস ক্লাবের বিরুদ্ধে ম্যাচ। স্বপন সেনগুপ্ত, সুধীর কর্মকার, আমার বয়স খুবই কম। ওই বছর আমাদের কোনও কোচ ছিল না। শান্তদা (মিত্র) আর প্রশান্ত সিনহা দলকে দেখাশোনা করত। পাস ক্লাবের ম্যাচের আগে আমাদের বলেছিল, তোরা জুনিয়র। তোরা জুনিয়ররা যদি দারুণ কিছু করিস, তাহলে জিতব।
আমাদের মতো জুনিয়রদের ওপর ভরসা করছে!‌ কথাগুলো আমাদের মনে গেঁথে গিয়েছিল। দুর্দান্ত খেলেছিলাম ওই ম্যাচে। কাৎসুমি, অর্ণব, লোবো, ডুডুর মতো সিনিয়রদের দায়িত্ব নিতে হবে জুনিয়রদের উদ্বুদ্ধ করার। তবে শুধু জুনিয়ররা ভাল খেললেই হবে না, সিনিয়রদেরও বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। শেষ দুটো ম্যাচে ডুডু, কাৎসুমি, আমনাকে নিজেদের আরও ভালভাবে মেলে ধরতে হবে। আর এদের উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব কোচের। ডুডুকে বলতে হবে, আগের ম্যাচে তুমি ৪ গোল করেছ। বাকি দুটো ম্যাচেও দলকে জেতানোর দায়িত্ব তোমার। সদস্য–সমর্থকরা তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এরপরেও যদি ডুডুর কোনও অনুভূতি না আসে, কিছু করার নেই। কোচের কাজ ফুটবলারকে মনে করিয়ে দেওয়া।
একটা ম্যাচের কথা বলি। ১৯৭৮–এর ডুরান্ড ফাইনাল। সুরজিৎ সেনগুপ্ত ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক। কোচ অরুণদা সুরজিৎকে বলেছিল, তুমি তো খুব বড় ফুটবলার। শ্যামল ব্যানার্জিকে ভেলকি দেখাও দেখি। সুরজিৎ এমন ফুটবল খেলেছিল, শ্যামল ব্যানার্জিকে পুরো মাটি ধরিয়ে দিয়েছিল। ওই বছর বরদলুই ট্রফিতেই থাইল্যান্ডের পোর্ট অথরিটির বিরুদ্ধে এইভাবে নিজেকে মেলে ধরেছিল সুরজিৎ। ডুডু, কাৎসুমিদেরও নিজেদের এইভাবে মেলে ধরতে হবে। আসলে ফুটবলারদের খোঁচা দিয়ে তাতিয়ে দিতে হবে। আর এই কাজটা করতে হবে কোচকে। তবে ফুটবলারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। নিজেদের মধ্যে তাগিদ নিয়ে আসতে হবে। হ্যাঁ, গোল মিস হবে, তাই বলে হতাশ হলে চলবে না। আরও বাড়তি উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
১৯৭৩–তে কলকাতা লিগে একটা ম্যাচে আকবর একের পর গোলের সুযোগ নষ্ট করছিল। প্রায় গোটা ছয়েক সহজ সুযোগ নষ্ট করার পরও আমার কাছে বল চাইছিল। বলছিল, ‘আর একটা পাস দে, ঠিক গোল করব।’ যেভাবেই হোক গোল করতেই হবে, এই দায়বদ্ধতা চোখে পড়েনি। এটা নিয়ে আসতে হবে। তাদের দিকে লক্ষ লক্ষ সমর্থক তাকিয়ে রয়েছে, এই ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। যদি সেটা মাথায় রেখে ৯০ মিনিট জান লড়িয়ে দেয়, চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার কোনও কারণ নেই। আর যদি চ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, সেটা হবে এবারের আই লিগের সবচেয়ে বড় অঘটন।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top