দেবাশিস দত্ত

 

‘‌ফ্লুক!‌’‌ ‘‌টেকনিকে সমস্যা’‌। ১৯৭১–‌এ অভিষেক সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে ৪ টেস্টে ৭৭৪ রান করার পরের ৩ বছরে কোনও সেঞ্চুরি করতে না পারার কারণে সুনীল গাভাসকার সম্পর্কে এ জাতীয় সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ৮টি টেস্টে বড় রান ছিল না। কী হয়েছিল?‌ কেন বারবার হোঁচট খেয়েছিলেন ওই সময়?‌ ৭১তম জন্মদিনের আগের দিন এই একটি প্রশ্নের সামনেই দঁাড় করিয়েছিল ‌আজকাল‌। 
গাভাসকার বললেন, ‘‌করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় যে ভয় এখন তৈরি হচ্ছে, তখন আমার শুধু মনে হত, আমি কি আর কামব্যাক করতে পারব না?‌ ওই সময় বেশ কয়েকজন প্রাক্তন ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জানতে চাইছিলাম, কোথায় ভুল হচ্ছিল। প্রথমেই ছুটেছিলাম ভিনু মানকড়ের কাছে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় ভিনুভাই ছিল আমাদের কোচ। বলেছিল, স্টান্স পাল্টে যাওয়ার কথা। বঁা কনুই থাকছিল মিড অনের দিকে। তাই অনের দিকে রান আসছিল না।’‌
এরপর গিয়েছিলেন পলি উমরিগড়ের কাছে, ‘যদি দেখ ফিল্ডারের কাছাকাছি বল যাচ্ছে, তাহলে খুব দ্রুত দৌড়ে প্রথম রান নিয়ে এনার্জি লস করার প্রয়োজন নেই। ২ রান নিশ্চিত জেনেই প্রথম রান নেওয়ার সময় গতি বাড়িও। অযথা শক্তিক্ষয় করলে বড় রানে পৌঁছনোর আগেই ক্লান্ত হয়ে যেতে হবে।’‌ বাসু পরাঞ্জপে বলেছিলেন, ‘শুরুর তিরিশ মিনিট বোলারকে দিতে হবে। নিজেকে ওই সময় পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্থ করে ফেলো।’‌ ছুটে গিয়েছিলেন পুনেয় বিশিষ্ট কোচ কমল ভাণ্ডারকারের কাছে। টানা সাতদিন দু’‌বেলা অনুশীলন করিয়েছিলেন। গাভাসকার মনে করেন, বাবা মনোহর সবচেয়ে বড় ত্রুটিটা ধরতে পেরেছিলেন, ‘‌বটমহ্যান্ডে সমস্যা হচ্ছিল। বঁা হাতের কড়ে আঙুলে চোট লাগার আশঙ্কায় ব্যাট সোজা আসছিল না। তখন উন্নত মানের গ্লাভস ছিল না। প্রায়ই কড়ে আঙুলে চোট পেতাম।’‌
অবশেষে ১৯৭৪ সালে ম্যাঞ্চেস্টারে সবুজ, প্রাণবন্ত উইকেটে জীবনের সেরা সেঞ্চুরি করেছিলেন, ‘‌সকালবেলা ড্রেসিংরুম থেকে উইকেটের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, টেকনিক এত খারাপ হয়ে গেল যে সেঞ্চুরি বন্ধ হয়ে গেল?‌ বৃষ্টির পর বলের গতি আরও বেড়ে গিয়েছিল। করোনাকে উইকেট দেব না বলে এখন যেমন দঁাতে দঁাত চেপে লড়ে যাচ্ছি, সেভাবেই সেবার সেঞ্চুরির আগে থামিনি। ১০১ রান করে রান আউট হয়ে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলাম ৫৮। ওইরকম দুঃসময় আর কখনও ক্রিকেট জীবনে আসেনি।’‌
এরপরই শোনালেন আর একটি ব্যর্থতার (‌মজারও বটে)‌ গল্প, ‘‌জীবনের প্রথম শূন্য। চুয়াত্তরেরই ইংল্যান্ড সিরিজে। বার্মিংহাম টেস্টের প্রথম বলে। কট নট ব আর্নল্ড। বলটা হঠাৎ লাফিয়ে গ্লাভসে লেগে উইকেটের পিছনে অ্যালান নট–‌এর গ্লাভসে জমা হওয়ার আগেই প্যাভিলিয়নের পথে হঁাটতে শুরু করেছিলাম। মজার ঘটনাটা ঘটেছিল লাঞ্চের সময়। ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে লাঞ্চরুমের দিকে এগোতেই দেখি আম্পায়ার অ্যালে ডাকছেন। একে শূন্য রানে আউট, তারপর আম্পায়ারের তলব। অস্বস্তি বাড়ছিল। প্রথমেই বললেন, এটা তুমি কী করলে?‌ ভেবেছিলাম, আউট হওয়ার কথা বোঝাতে চাইছেন। ব্যাখ্যা করলাম। আবার সেই এক প্রশ্ন, এটা তুমি কী করলে?‌ এভাবে বারবার একই প্রশ্ন করার পর আম্পায়ার বলেছিলেন, ‘‌এটা আমার প্রথম টেস্ট। প্রথম বল। প্রথম দিন। আর আমি কিনা প্রথম আউট হওয়া ব্যাটসম্যানের উদ্দেশ্যে আঙুল তুলতে পারলাম না। তুমি নিজেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেলে!‌’‌ ততক্ষণে অস্বস্তির অবসান, সমবেত হাস্যরোল।‌

অভিষেক সিরিজে সানি। ফাইল ছবি

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top