শ্যাম থাপা: আক্ষেপের মাত্রা হয়। আর তা বাড়ে–কমেও। কিন্তু বেশ কিছুদিন হল একটা বিষয় ঘিরে আক্ষেপের মাত্রা বেড়েই চলেছে। আই লিগে বাংলার ফুটবলের দাপট কেন কমছে?‌ প্রশ্নটা ভাবাচ্ছে যত বেশি, মাঠে তার প্রতিফলন দেখছি না সিকি ভাগও। প্রত্যেকবার আই লিগ শুরুর আগে আমরা ভাবি, এবার ইস্টবেঙ্গল নয় মোহনবাগান জিতবে। কিন্তু লিগ যত এগোয়, ততই মিলিয়ে যায় আশা। একসময় বাস্তবটা পরিষ্কার হয়ে যায়। না, এবারও হল না। অথচ এমন নয় যে আমাদের রাজ্যে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ কম। এমন নয় যে ফুটবল নিয়ে অন্য কোনও রাজ্যে আমাদের থেকে বেশি শব্দ খরচ হয় রোজকার সংবাদপত্রে। এত ভালবাসা, এত বিশ্লেষণ, এত আবেগ— তাও কেন ছবিটা বদলাচ্ছে না?‌ উত্তর খুঁজতে খুঁজতে যখন ক্রমশই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম, সেই সময় এবারের আই লিগের গতি বদল অদ্ভুত এক আশা জাগিয়েছে। ইস্টবেঙ্গলের সামনে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। অথচ বড় ম্যাচে হারের পর মনে হয়েছিল, এই ইস্টবেঙ্গলের কিছু হওয়ার নেই। সেখানে সেই দলটাই এবার হট ফেবারিট!‌ এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার সেটা হল মোটিভেশন। ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব সমর্থকদের। কর্মকর্তাদের। প্লেয়ারদের নিজেদেরও। 
আমি যখন ফুটবল খেলতাম, সেই সময় ডুরান্ডে হয় ইস্টবেঙ্গল না হয় মোহনবাগানের দাপট। বিপক্ষের কাছে হারলেই আগুন জ্বলত বুকের ভেতর।‌ হারার পর এক মাস লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতাম না। প্র‌্যাকটিসে যেতাম মাথা নিচু করে। আর ভেতরে ভেতরে নিজেকেই নিজে বলতাম, পরের ম্যাচে বদলা নিতেই হবে। কিন্তু বদলা না নেওয়া পর্যন্ত গালি হজম করতাম। কখনও কখনও তো অফিস যেতেও পারতাম না। হারের জ্বালা যে কী ভয়ঙ্কর, জানি। সেই জ্বালায় এখনকার ফুটবলাররা জ্বলে কিনা বলতে পারব না। তবে চাই না, এবার অন্তত সেই জ্বালায় ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের জ্বলতে হোক। দলে বেশ কিছু ভাল প্লেয়ার আছে। বিদেশিরা ভাল। তা হলে কেন পারবে না?‌ পারতে হবেই। আমি তো বলব এই দলটার ৯০ শতাংশ সুযোগ রয়েছে এবার আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। লাজং আর নেরোকাকে হারানো এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু তারপরও যদি না পারে তা হলে বলব, ঢিলেঢালা মনোভাব আর খিদের অভাবে হেরেছে। একটু মন দিক। তা হলেই কাঙ্ক্ষিত জয় এসে যাবে। তবে ট্যাকটিক্যালি ঘুঁিট সাজানোটা নির্ভর করছে কোচের ওপর। বিপক্ষের দুর্বলতা, শক্তির জায়গাগুলো মার্ক করে দলটা সাজিয়ে নিক। 
আমরা কোচের কথা অক্ষরে অক্ষরে শুনে চলতাম। কোচ পিকে ব্যানার্জি তো প্লেয়ারদের নাম বলে বলে দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন। বারবার বোঝাতেন জার্সির জন্য গর্ব করো, দলের জন্য করো। লাখো লাখো সমর্থকদের চাহিদার মূল্য বোঝো। প্রদীপদা যখন এভাবে বোঝাতেন, তখন যেন চোখের সামনে মাঠটা দেখতে পেতাম। মনে হত, নেমে যাই। এখনই। কীভাবে এগোব, কীভাবে গোল করব মনে–মনে ছক কষতাম। চাইব, খালিদও প্লেয়ারদের এভাবেই তাতাক। বোঝাক, এই জার্সিটা গায়ে দেওয়ার গর্ব কতখানি। 
দায়িত্ব ক্লাব অফিসিয়ালদেরও। সারা বছর তো অনেক কিছু নিয়ে ওঁরা মাথা ঘামান। এই মুহূর্তে কিন্তু একটাই কাজ। প্লেয়ারদের অনুপ্রাণিত করা। যেভাবেই হোক সেটা করতে হবে। ম্যানেজার ও প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে মনোরঞ্জন আছে। নিশ্চিত, ও প্লেয়ারদের বোঝাবেই। 
বেশিরভাগ লোকই বলেন, হোম অ্যাডভান্টেজের কথা। এই ব্যাপারে আমার ভাবনা উল্টো। আমি তো বলব, ঘরের মাঠে চাপটা অনেক বেশি থাকে। সেখানে গোল খেলে গালি খেতে হয় অনেক অনেক বেশি। আর সেটা ভেবেই অনেক প্লেয়ারের পা কাঁপতে থাকে। আমাদের সময়ও দেখেছি। তাই বাকি দুটো ম্যাচ ইস্টবেঙ্গল বাইরে খেলায় শাপে বর হয়েছে। পাহাড় প্রমাণ চাপটা থাকবে না। কাঁপুনি ধরার সম্ভাবনাও সে অর্থে কমবে। ফলে খোলা মনে খেলতে পারবে ফুটবলাররা। 
জানি, দুনিয়াটা এখন বড্ড পেশাদার। মরশুম শেষের আগেই তাই প্লেয়াররা ভাবতে থাকে কোন ক্লাবে যাব। কোথায় মোটা অঙ্কের টাকা পাব। ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের কাছে আমার অনুরোধ, এই দুটো ম্যাচ অন্য সব অঙ্ক ভুলে থাকো। তোমরা শুধু দুটো ম্যাচ জিতে ফেরো। শুধু ইস্টবেঙ্গল নয়, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার সম্মান বাঁচানোর দায়িত্ব এখন তোমাদের কাঁধে। তোমরা পারবে, বিশ্বাসটা রাখো। বিশ্বাস রাখছি আমি, আমরাও। এবার আই লিগ বাংলাতেই আসবে। তোমাদের হাত ধরে। ‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top