নির্মলকুমার সাহা: দারিদ্র‌্য তাঁর চিরদিনের সঙ্গী!‌ বাবা বয়েন বিশ্বাস ছিলেন দরিদ্র চাষি। সংসার চালানোই ছিল কঠিন। সেখানে মেয়ে ফিরোজা খাতুন খেলাধুলোয় চলে আসায় সমস্যাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। তবু বয়েন এবং তাঁর স্ত্রী কাঞ্চন মেয়েকে যতটা পেরেছেন খেলাধুলোয় উৎসাহ দিয়েছেন। সেই উৎসাহে তরতর করে এগিয়ে ফিরোজারও সাফল্য এসেছে। জেলা, রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে জাতীয় আসরেও বাংলার হয়ে অংশ নিতে দেখা গেছে ফিরোজাকে। জিতেছেন পদকও। ফিরোজার ইভেন্ট ছিল ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়। ওই দুই ইভেন্টেই এসেছে সাফল্য। এখনও নদিয়া জেলা অ্যাথলেটিক্সে ১০০ ও ২০০ মিটারে মহিলাদের রেকর্ড ওঁর নামের পাশেই উজ্জ্বল। যা ফিরোজা করেছিলেন ১৯৯১ সালে কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের হয়ে। ওই স্কুলেই তখন ছিল সাইয়ের একটা কেন্দ্র। সেই সাইয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ফিরোজা। ওখানেই তখন পাশাপাশি ‘‌বড়’‌ হচ্ছিলেন সরস্বতী (‌দে)‌ সাহা। জুনিয়র জাতীয় আসরে ভাল ফল করে ফিরোজা ডাক পেয়েছিলেন জুনিয়র জাতীয় শিবিরেও। এভাবে যখন এগোচ্ছিলেন তখনই ছন্দপতন। মারা যান ফিরোজার বাবা বয়েন বিশ্বাস। সংসারে নেমে আসে আরও দারিদ্র‌্য। বাড়ির লোকেরা অ্যাথলেটিক্স ছাড়িয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেন। এটা বাইশ বছর আগের ঘটনা। 
বিয়ে মানে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার কাছাকাছি নদিয়া জেলার মধুগারি গ্রামের এক দরিদ্র পরিবার থেকে ওই জেলারই জয়রামপুর গ্রামে আর এক দরিদ্র পরিবারে চলে আসা। যাঁর সঙ্গে ফিরোজার বিয়ে হয়, সেই আশরাফুল মিয়াঁ বিড়ি বাঁধার কাজ করতেন। এখনও সেই কাজ করেই সংসার চলে। পরিবর্তন বলতে একটাই, বিয়ের পর থেকে ওই বিড়ি বাঁধার কাজে হাত লাগাতে হয়েছে ফিরোজাকেও। বছরের পর বছর বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে আশরাফুলের শরীরে ঢুকে পড়েছে নানা রোগ। যেমন ফিরোজা বলছিলেন, ‘‌এরই মধ্যে ওর স্ট্রোক হয়ে গেছে ২ বার। কোনওভাবে বেঁচে গেছে!’‌ 
মাটির মেঝে, টালির চাল, হোগলা পাতা আর পাটকাঠির বেড়ার ঘর। তার মেঝেতে বসেই স্বামী–স্ত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিড়ি বেঁধে চলেন। ফিরোজা বলছিলেন, ‘‌এখানে একজন বিড়ির ব্যবসা করেন। তাঁর কাছে থেকে অর্ডার নিয়ে আমরা বিড়ি বাঁধি। এক হাজার বিড়ি বাঁধার মজুরি আশি টাকা। দিনে হাজারের বেশি বিড়ি বাঁধা হয়ে ওঠে না। সংসারের কাজও তো আছে।’‌ বিড়ি বাঁধার পাশাপাশি বছর সাতেক অন্য একটা কাজ অবশ্য পেয়েছেন ফিরোজা। কিন্তু তাতে সংসারের হাল ফেরেনি। ফিরোজা বলল, ‘‌মিড–‌ডে মিল রান্নার কাজ। তিন হাজার তিনশো টাকা মাস মাইনে। কোনওভাবে দুই মেয়ে প্রিয়াঙ্কা আর হীরার বিয়ে দিয়েছি। হীরা একসময় আমার মতো অ্যাথলেটিক্স করতে শুরু করেছিল। খরচ চালাতে পারিনি বলে ছেড়ে দেয়। আর ছেলে বিদ্যুতের বয়স এখন ১৬ বছর। ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। ওর লেখাপড়া চালাতেও তো অনেক খরচ। ছেলেটাও অ্যাথলেটিক্স শুরু করেছিল। আমার মতো ১০০ ও ২০০ মিটার। এখন ওর দৌড়ও বন্ধ আছে। কী করে খেলাধুলো, লেখাপড়া একসঙ্গে চালাব!‌’‌ 
ফিরোজার মনে আছে সরস্বতীকে। বলছিলেন, ‘‌বেশ কয়েক বছর আগে দোকান থেকে মুড়ি কিনে আনি। ঠোঙার কাগজটায় সরস্বতীর অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার খবর আর ছবি। যা দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পুরনো অনেক কথা মনে পড়েছিল। কেঁদে ফেলেছিলাম। আমিও তো পারতাম বড় হতে। কী আর করব!‌ গরিবের পাশে কেউ থাকে না। তাই আমি হারিয়ে গেছি!‌’‌ সরস্বতীরও মনে আছে ফিরোজাকে। বলছিলেন, ‘‌আমার আগেই ও জুনিয়র ইন্ডিয়া ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিল। খুব ভাল স্প্রিন্টার ছিল।’‌ 
কাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। মহিলাদের নিয়ে দেশে–‌বিদেশে নানা অনুষ্ঠান হবে। ফিরোজার দিনটা কাটবে একইভাবে। সকালে উঠে মিড–‌ডে মিলের রান্না করতে যাওয়া। বাড়ি ফিরে ঘর–সংসারের কাজ করে বিড়ি বাঁধতে বসা। এভাবেই চলবে লড়াই। এভাবেই বেঁচে থাকবেন ফিরোজারা। 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top