লাজং ২ 
(আইবানহা, স্যামুয়েল-‌পেনাল্টি)‌
ইস্টবেঙ্গল ২ (ডুডু ‌২)‌ 

মুনাল চট্টোপাধ্যায়, শিলং, ৫ মার্চ- ‘‌শেষের কবিতার’‌ শহরে নিজেদের শেষটা দেখেই ফেলল ইস্টবেঙ্গল। আই লিগের ট্রফিটা বলতে গেলে ফেলেই গেল এখানে। মোহময়ী শিলংয়ের নেহরু স্টেডিয়ামের মাঠে পাহাড়ি বিছে লাজংয়ের হুলে বিদ্ধ হয়ে ২–‌‌২ ফলে ম্যাচ শেষ করল। ১৪ বছরের আই লিগ ট্রফি না পাওয়ার দুঃখ মোচনের স্বপ্নটা অধরাই থেকে যেতে পারে এর ফলে। 
১৭ ম্যাচে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের শীর্ষে ফেরার সুযোগ হাতছাড়া করার পাশাপশি এখন অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া আর কোনও সম্ভাবনা খোলা থাকল না ইস্টবেঙ্গলের। এখন শুধু ঘরের মাঠে শেষ ম্যাচে নেরোকার বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের জিতলেই চলবে না, মোহনবাগান ও মিনার্ভাকেও শেষ ম্যাচে পয়েন্ট হারাতে হবে। 
অনেক খরচ করে কলকাতা থেকে বিশাল সংখ্যায় ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা প্রিয় দলকে উৎসাহ দিতে এসেছিলেন শিলংয়ে। তাঁদের সেই আসা মূল্যহীন হয়ে পড়াতে স্বাভাবিকভাবে হতাশ। ম্যাচ চলাকালীন লাজংয়ের সমর্থকদের সঙ্গে তাঁদের বচসাও বেঁধেছিল গ্যালারিতে। ড্র হওয়ার পর আর তাঁরা প্রতিপক্ষ সমর্থকদের সঙ্গে কোনও ঝামেলায় জড়ানোর জোর পাননি। তবে যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হল ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের। 
অথচ ইস্টবেঙ্গলের শুরু হয়েছিল বেশ চমকপ্রদ। মনে হয়েছিল, পাহাড় থেকে পুরো পয়েন্ট নিয়ে তারা কলকাতায় নেরোকা বধের জন্য ঝাঁপাবে। গোল করে এগিয়ে গিয়েও আশ্চর্যরকম ছন্দপতন। ২০ মিনিটে আমনা বল বাড়িয়েছিলেন বাঁদিকে চুলোভাকে। তাঁর তোলা ক্রশ বক্সে পড়ার মুখে ডুডু মাথা ছোঁয়ালে গোলকিপার নিধিনলালের হাতের নাগাল এড়িয়ে লাজংয়ের জালে জড়িয়ে যায়। বক্সের মাঝে যতটা লাফিয়ে উঠে বলে মাথা লাগালেন নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার, তাতে জোর গলায় তিনি বলতেই পারেন, বুড়ো যে আমি নই, সেটার প্রমাণ তো দিলাম। ফর্ম টেম্পোরারি, ক্লাস পার্মানেন্ট। খেতাবী লড়াইয়ে এখনও কিছুটা রেখে দেওয়ার সমতা ফেরানোর ৮৭ মিনিটের গোলটাও তো ডুডুরই করা। ক্রোমার সেন্টারে মাথা ছুঁইয়ে। 
প্রথম গোল খেয়ে চাপে পড়ে যায় লাজং। আমনা, কাৎসুমি, ক্রোমাদের মিলিত আক্রমণের ঝাঁজে প্রতিপক্ষ ডিফেন্স তখন এলোমেলো, বাঁধুনিহীন। তাতেই ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ এসেছিল লাল হলুদ ব্রিগেডের সামনে। দু’‌মিনিট বাদেই ক্রোমার জোরালো গড়ানো শট লাজং গোলকিপার নিধিনলালের হাত থেকে বেরিয়ে আসার মুখে ডুডু একটু তৎপর হলে গোলে ঠেলতে পারতেন। বিপদ বুঝে সময়ে লাজং ডিফেন্ডার ক্লিয়ার করেন কর্নারের বিনিময়ে। পরের মিনিটেই আমনার থ্রু থেকে বল পান ক্রোমা। বল নিয়ে বাঁদিক ধরে গতি বাড়িয়ে বক্সে ঢুকে পড়ে উঁচু শট নিলে অল্পের জন্য তা বাইরে যায়। বক্সের ভেতর সুবিধাজনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ডুডু। স্বার্থপরতা ভুলে বলটা ডুডুকে দিলে ম্যাচের ওপর পুরোপুরি দখল নিয়ে ফেলতে পারত খালিদ বাহিনী। 
উল্টে দ্বিতীয় গোল খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়ে রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে বেরোয় লাজং ফুটবলাররা সমতা ফেরানোর লক্ষ্যে। লাজং ফুটবলারদের তার আগে দেখা গিয়েছিল ৫–‌‌৪–‌‌১ ছকে আগাগোড়া রক্ষণাত্মক খেলতে। রক্ষণে এতটাই ভিড় জমাচ্ছিলেন লাজংয়ের ফুটবলাররা, খালিদের ৪–‌‌৫–‌‌১ ছকে খেলার কৌশল মার খাচ্ছিল। ডুডু যাতে সামনে একা হয়ে না পড়েন, সে কারনে ক্রোমাকে বাঁদিকের উইংয়ে আর আমনাকে রোমিং ফুটবলারের ভুমিকায় রেখে আক্রমণের ধার বাড়াতে চেয়েছিলেন কোচ খালিদ। তবে নাইজেরীয় ওডাফিনকে আমনার গায়ে লাগিয়ে রাখেন লাজং কোচ আলিসন, ইস্টবেঙ্গল আক্রমণের মূল উৎস সিরিয়ান মিডফিল্ডার এটা বুঝে। তবু ডুডুর দক্ষতায় গোল করে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। 
কিন্তু ম্যাচের রাশটা প্রথমার্ধের শেষ ১৫ মিনিট চলে যায় লাজংয়ে হাতে। তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে উঠতেই লাল হলুদ রক্ষণের দৈন্যদশাটা প্রকট হয়ে পড়ল এদিন আবার। কার্ড সমস্যায় এদিন এডু ছিলেন না। তাঁর জায়গায় স্টপারে গুরবিন্দারের পাশে সালামকে জুড়ে দিয়েছিলেন কোচ খালিদ। দুই সাইড ব্যাকে মেহতাব ও চুলোভাকে। এঁদের কাউকেই আর আত্মবিশ্বাসী লাগেনি লাজং আক্রমণ শানাতে। গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পরও নবীন মেহতাবকে মাঠে রেখে দেওয়ার ভুলটা কোচ খালিদের। রালতেকে না খেলানোটাও যেমন একটা বড় ভুল এদিন। কাৎসুমির উইংয়ে না খেলে মাঝে পিছিয়ে খেলাটাও তো বুমেরাং হয়ে গেল। খালিদের উচিত ছিল মেহতাবকে তুলে সাইডব্যাকে সালামকে পাঠিয়ে স্টপারে অভিজ্ঞ অর্ণবকে গুরবিন্দারের পাশে খেলানো। সেই ভুলের খেসারত দিয়ে দুগোল হজম ইস্টবেঙ্গলের। 
৪৯ মিনিটে স্যামুয়েলের ফ্রিকিকে হেডে সমতা ফেরান আইবানহা। ৬৮ মিনিটে কোফির থেকে বল পেয়ে বক্সের মধ্যে স্যামুয়েল ঢুকতেই তাঁকে ফাউল করেন মেহতাব। রেফারি পেনাল্টি দেন। স্যামুয়েল গোল করে ২–‌‌১ করতে ভুল করেননি। ডুডুর সমতা ফেরানোর গোলের আগে ইস্টবেঙ্গলের সামনে আরও সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল, যা তারা নষ্ট করে। ম্যাচের সেরা লাজং গোলকিপার নিধিনলালের প্রশংসাও করতে হবে দলকে এক পয়েন্ট এনে দেওয়ার জন্য। ব্রেন্ডনের দুটি শট যেভাবে বাঁচালেন, তা অবিশ্বাস্য। তিনি লাজংয়ের গোলে না থাকলে ইস্টবেঙ্গল নিশ্চিত ৩ পয়েন্ট নিয়ে ফিরতে পারত।
ইস্টবেঙ্গল:‌ উবেদ, মেহতাব (সামাদ)‌, গুরবিন্দার, সালাম, চুলোভা, ব্র‌্যান্ডন (জবি)‌, লোবো (‌গ্যাব্রিয়েল)‌, কাৎসুমি, আমনা, ক্রোমা, ডুডু।‌‌

নায়ক ডুডু। তবু শেষ পর্যন্ত মাথা হেঁটই থাকল কাৎসুমিদের।- ফাইল চিত্র

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top