সৌমিত্র কুমার রায়: ইস্টবেঙ্গল কর্তা ও ফুটবলারদের রেফারি–নিগ্রহের ঘটনায় সমালোচনা ময়দান জুড়ে। নিন্দা রেফারি মহলেও। বাংলার প্রাক্তন তারকা, ফিফা রেফারি থেকে প্রাক্তন জাতীয় রেফারি— কেউই বিষয়টা মানতে পারছেন না। তাঁদের মতে, ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় ক্লাবের কাছ থেকে এ ঘটনা কাম্য নয়।
পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন মাথাচাড়া দিচ্ছে। প্রতি বছর ইস্টবেঙ্গল দিবসে রাজ্যের রেফারিদের সংবর্ধিত করা হয়। সংবর্ধনা দেওয়া হবে আবার ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ খেলাতে গিয়ে আক্রান্তও হতে হবে। এটা কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?
মঙ্গলবার প্রাক্তন ফিফা রেফারি প্রদীপ নাগ বললেন, ‘দুঃখজনক ঘটনা। কোনওমতেই মানা যায় না। যে ম্যানেজার রেফারিকে হেনস্থা করেছেন, মনে হয় তিনি ময়দানের নতুন মুখ। মাঠে বড় কর্তারা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে উনি এই কাণ্ড ঘটালেন ভেবে অবাক লাগছে। লজ্জাজনক ঘটনা।’ পাশাপাশিই তাঁর বক্তব্য, ‘কদিন আগেই রেফারির গায়ে হাত তোলার জন্য সাদার্নের শ্যাম মণ্ডলকে দু’বছর নির্বাসনের শাস্তি দিয়েছে আইএফএ। আইএফএ–র উচিত ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রেও এমনই কড়া শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া।’ 
প্রাক্তন জাতীয় রেফারি ভোলা দত্ত মনে করেন, ইস্টবেঙ্গল মাঠের এই ঘটনায় রেফারিদের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। ইস্টবেঙ্গল মাঠের  ঘটনায় তরুণ রেফারিরা শঙ্কিত হয়ে পড়বেন।’ আরও বললেন, ‘গত মরশুমে কলকাতা লিগে জর্জের বিরুদ্ধে ০–১ পিছিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। মাঠে ছিলাম আমি। তখনও ওই ম্যানেজারের (দেবরাজ চৌধুরি) আচরণ ভাল ঠেকেনি। আমরা ম্যানেজার হিসেবে স্বপন বলকে দেখেছি। সেই আসনে বসে ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে এত মাথাগরম করা চলে না। তাতে ক্লাবেরই সম্মানহানি হবে।’ 
বর্ষীয়ান প্রাক্তন রেফারি সাগর সেন মনে করছেন, ‘এখন সমর্থক–ফুটবলাররা হেরে গেলেই অহেতুক রেফারিকে আক্রমণ করছে। গ্রামগঞ্জেও বিষয়টা ভয়াবহ আকার নিয়েছে।’
বস্তুত, সোমবারের ঘটনার পর বাংলার রেফারি মহলে আলোচনা চলছে, আগামী বছর ইস্টবেঙ্গল দিবসে রেফারি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বয়কট করা যায় কি না। প্রদীপ নাগ সরাসরি বললেন, ‘সত্যিই এবার এটা ভাবার সময় এসেছে।’ একধাপ এগিয়ে সাগর সেন বললেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বয়কট করা উচিত রেফারিদের। সম্মান আগে। তার পর সংবর্ধনা।’ যা শুনে কলকাতা রেফারি সংস্থার সহ–সভাপতি, প্রাক্তন ফিফা রেফারি চিত্তদাস মজুমদার জানালেন, ওই বিষয়ে সংস্থার কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেবে। প্রাক্তন জাতীয় রেফারি বিকাশ মুখার্জি রেফারি কাউন্সিলের সদস্য। তাঁর কথায়, ‘সত্যিই এটা ভাবার বিষয়। যে ক্লাব সংবর্ধনা দেবে, তারাই আবার রেফারি পেটাবে, এটা মানা যায় না। সংবর্ধনা গ্রহণ না করার বিষয়ে কাউন্সিল মিটিংয়ে প্রস্তাব রাখব। আমাদের সময়ে শিশির ঘোষ, দেবজিৎ ঘোষরাও মাথা গরম করত। কিন্তু কখনও রেফারির গায়ে হাত তোলেনি। ওরা রেফারির সঙ্গে হম্বিতম্বি করেছে, গলা উঁচিয়ে কথা বলেছে। রেফারির গায়ে হাত তোলার অর্থ, ফুটবলার–কর্তাদের সংস্কৃতির পরিচয় দেওয়া।’ 
ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার অবশ্য বলছেন, ‘ক্লাব আগামী বছরও সংবর্ধনা দেবে। ওঁরা নেবেন কিনা, সেটা ওঁদের ব্যাপার। ক্লাবের কর্তব্য আমন্ত্রণ জানানো। তা ওঁরা রক্ষা করবেন কি না, তা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে ঘটনাটি নিন্দনীয়।’ একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতে, ওটা পেনাল্টি না–ও দিতে পারতেন রেফারি। রেফারিংয়ের মান যেমন উন্নত হওয়া উচিত, তেমনই অনভিপ্রেত ঘটনাও বন্ধ করতে হবে।’

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top