অশোক দাশগুপ্ত: প্রথমে ব্যাট করে ৩৫২। বাকি ম্যাচ হাসতে হাসতে দেখার কথা। চা, টা, টুকটাক গল্প। ম্যাচ তো জেতা হয়েই গেছে। একদিনের ক্রিকেটে ৩৬ রানের ব্যবধান যথেষ্ট বড়। তবু, একটা সময় অনিশ্চয়তার ছোঁয়া কি লাগছিল না?‌ গোটা ক্রিকেট–‌বিশ্ব জানে ও মানে, ভারতের প্রথম তিন ব্যাটসম্যান টিমের সম্পদ, বিপক্ষের ত্রাস। একই দিনে তিনজনই রান পেলে আমাদের কে আটকায়?‌
১৯৮৩। ফাইনালে ভারত করেছিল মাত্রই ১৮৩, সর্বোচ্চ রান শ্রীকান্তের ৩৮। রবার্টসকে মারা স্কোয়্যার ড্রাইভটা যতই রূপকথায় ঢুকে গিয়ে থাকুক, শটটা থেকে তো ৪–‌এর বেশি পাওয়া যায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৪০ রানে শেষ করে দেওয়া গিয়েছিল। ব্যবধান ৪৩।
কী করে সম্ভব হয়েছিল?‌ কপিলের ভিভ–‌ক্যাচ, হ্যাঁ। কিন্তু এত বড় একটা টিমকে, যেখানে চার ব্যাটসম্যানের নাম গ্রিনিজ, হেনেস, রিচার্ডস, লয়েড, পরেও ল্যারি গোমস, কী করে পেরেছিলাম আমরা?‌ বিশ্বমানের বোলার বলতে শুধু কপিলদেব। একা পারতেন না। মহিন্দর অমরনাথ মোটামুটি মিডিয়াম পেসার, যিনি পিচ ও পরিবেশকে ব্যবহার করলেন। বলবিন্দর সিং সাঁধু, যিনি কার্যত অখ্যাতই ছিলেন, ফিরিয়ে দিলেন বিধ্বংসী গর্ডন গ্রিনিজকে। আউট স্যুইং ভেবে জাজমেন্ট দিলেন এবং বোল্ড। ইনস্যুইং। রজার বিনি একটু ব্যাটিং, একটু ফিল্ডিং, একটু বোলিং নিয়ে টিমে। গোটা টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক। ফাইনালেও। বেঁধে রেখেছিলেন। এবং মদনলাল। ভিভ যখন প্রবল মারতে শুরু করেছেন, ম্যাচ বেরিয়ে যায়–‌যায়, ক্যাপ্টেন কপিলের কাছ থেকে বল চেয়ে নিলেন মদনলাল। পরে অধিনায়ক বলেছেন, ‘বল ‌কেড়ে নিল’‌–‌ও বলা যায়। সেই ওভারেই ক্যাচ উঠল এবং ৩০ গজ ছুটে কপিলের অবিস্মরণীয় ক্যাচ। পরে মহিন্দর অমরনাথ বলেছিলেন, ‘‌মদনলাল ঠিক জায়গায় বলটা রেখেছিল। আর, মারমুখী ভিভের বিরুদ্ধে বল করার চ্যালেঞ্জটা নিজে থেকে নেওয়ার সাহস?‌ ওর ছিল।’‌ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৪০–‌এ চুরমার করায় পাঁচ বোলারেরই অবদান ছিল। টিমওয়ার্ক। যা ছাড়া চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। একটা টিম তিন–‌চারজন সুপারস্টারকে নিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু অন্যরা কিছু না কিছু করে না গেলে, কাপ জেতা যায় না। ভয়ঙ্কর ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমটার কথা ভাবুন। ব্যাটিংয়ে চারটে বাঘ, গ্রিনিজ, হেনেস, রিচার্ডস, লয়েড। তবু উইকেটকিপার জেফ্রি দুজনকে প্রয়োজনে চমৎকার ব্যাট করে যেতে হত, তখন মনে হত, নামটা দুজন, আসলে যেন একাই তিনজন। ল্যারি গোমসও দরকারে রান করে যেতেন। আর চারটে বোলার?‌ সেই একই প্রাণীর নাম বলতে হয়, বাঘ। রবার্টস, হোল্ডিং, মার্শাল, গার্নার। কেউ অসুস্থ থাকলে, কলিন ক্রফট। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেরা ছিল কোনও একজন বা তিনজনের জন্য নয়, অনেকে ছিলেন, টিমওয়ার্ক।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এবার ভারত ৩৫২। শিখর ১১৭, বিরাট ৮২, রোহিত ৫৭। তিনজনে মিলেই ২৫৬। আর কী চাই?‌ চাই। রানটা যদি ৩৫২–‌এর জায়গায় ৩২০ থাকত, এমনকী ৩৩০, অস্ট্রেলিয়া বিশ্বাস করে ক্রিজে নামত, জেতা যাবে। পান্ডিয়া ২৭ বলে ৪৮। ধোনি ১৪ বলে ২৭। লোকেশ রাহুল ৩ বলে ১১। ৪৪ বলে ৮৬। ৪৪ বলে ৬৩ হলেও ম্যাচ রাখা কঠিন ছিল। স্টার্ক–‌কামিন্সদের বিরুদ্ধে স্রেফ চালিয়ে রান পাওয়া যায় না। চাই টেকনিক। সাহস।
বুমরা পৃথিবীর এক নম্বর। ভুবনেশ্বর সম্প্রতি ফর্ম–‌এ ছিলেন না, আইপিএল–‌এও ব্যর্থই বলতে হবে। ইংল্যান্ডের পিচ ও আবহাওয়ার কথা ভেবে খেলানো হল, সামিকে বসিয়ে। তিনটে উইকেট নিয়ে গেলেন। চাহাল তো অবশ্যই, কুলদীপও ডোবাননি। ইদানীং উইকেটে নেই, রহস্য যেন ফাঁস হয়ে গেছে, টিমে জায়গা থেকে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন। কিন্তু, ওই যে বললাম, কুলদীপ ডোবাননি। পাশ। স্পিনার হিসেবে আরও বেশি নম্বরের দৌড়ে এসে গেছেন জাদেজা, তবু ফর্ম–‌হারানো বোলারটিও চূড়ান্ত ব্যর্থ নন। কেদার যাদব একটা বলও খেলার সুযোগ পাননি, এক ওভারে দিয়েছেন ১৪, কিন্তু বাকি দশজনের কম–‌বেশি অবদান। দশে মিলি করি কাজ।
বিশ্বকাপ, কেউ একা জিতিয়ে দেবে না। কোনও তিন–‌চারজনও না। অনেককে কিছু করে যেতে হবে। লম্বা টুর্নামেন্ট। কাপ এখনও বহু দূর। তবু, মনে কি পড়ছে, ১৯৮৩?‌‌‌‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top